
বাংলাদেশে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়লেও নতুন মূলধন আসার প্রবাহে গতি নেই। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে নিট এফডিআইয়ের পরিমাণ বেড়েছে ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান উৎস নতুন বিনিয়োগ নয়; বরং আগে থেকেই দেশে ব্যবসা পরিচালনাকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগ।
একই সময়ে নতুন ইকুইটি মূলধন বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলোর নিজেদের মধ্যে ঋণ লেনদেনের নিট প্রবাহেও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে।
সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। সংস্থাটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত তিনটি উপায়ে আসে। এগুলো হলো—বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ, নতুন ইকুইটি মূলধন এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর মধ্যে আন্তঃকোম্পানি ঋণ।
নিট এফডিআইয়ের ৭৫ শতাংশ এসেছে মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ থেকে
ইনভেস্ট বাংলাদেশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার। এর মধ্যে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলার এসেছে আগে থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। অর্থাৎ, মোট নিট এফডিআইয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশই এসেছে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
এতে সামগ্রিক বিদেশি বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন আসার গতি নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আলোচ্য তিন মাসে নিট ইকুইটি মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। আগের বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় এই বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃকোম্পানি ঋণের নিট প্রবাহ ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলারে নেমেছে। এ সময়ে এ খাতে মোট ঋণপ্রবাহ ছিল ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। তবে আগের নেওয়া ঋণ পরিশোধের কারণে নিট প্রবাহের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ঝুঁকিতে বিদেশি বিনিয়োগ
বিদেশি বিনিয়োগের এই পরিস্থিতির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যকে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, এসব পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়েই বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিনিয়োগ উন্নয়ন উইংয়ের সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যেও বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক অবস্থানের কারণে নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এখনো কঠিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এটি দেশের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা সম্পর্কে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থার প্রতিফলন। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বিনিয়োগ পরিবেশের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি। নাহিয়ান রহমান রচি জানান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের বিনিয়োগ পাইপলাইনে থাকা ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পগুলোকে বাস্তব বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিতে কাজ চলছে। সম্প্রতি কয়েকটি বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ঘোষণাকেও তিনি আশাব্যঞ্জক হিসেবে উল্লেখ করেন।
অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি
দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এসব অঞ্চলে নিট এফডিআই এসেছে ৪ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ২৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কম।
তবে আগের প্রান্তিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আগের তিন মাসের তুলনায় বিনিয়োগ বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তা কম রয়েছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা ইপিজেডের বাইরের খাতগুলোতে নিট এফডিআই ২০ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে ২৮০ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফলে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগ কমলেও অন্যান্য খাতে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
নাহিয়ান রহমান রচি জানান, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে বিনিয়োগের উপযোগী করে তোলাও ইনভেস্ট বাংলাদেশের অন্যতম অগ্রাধিকার। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিলম্বিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের উন্নয়নকাজ এখন এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পটির উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। এ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইনভেস্ট বাংলাদেশের প্রকাশিত ১৮০ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ পর্যন্ত অর্জিত সাফল্য এবং বাকি কাজের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আগ্রহকে বাস্তব মূলধন বিনিয়োগ, কার্যকর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মসংস্থানে রূপান্তর করতে সংস্থাটির কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।