
‘ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।’—সংসদে এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও আইন ও অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনা না করে কোনো কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া যায় না।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাগেরহাট-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. আব্দুল আলীমের এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের তথ্য তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে এ প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থমন্ত্রী জানান, গত ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের—৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৮ হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
এস আলম গ্রুপকে নতুন ঋণ দেওয়ার প্রসঙ্গে
ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতি ও আর্থিক খাত পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। ব্যক্তি ও কোম্পানি একই বিষয় নয়; একটি কোম্পানি স্বতন্ত্র আইনগত ও করপোরেট সত্তা।
আমির খসরু বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার হবে। তবে কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে একটি কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসংস্থান, ঋণ ও দায় এবং অর্থনীতিতে তার অবদানের বিষয়গুলো জড়িত।
এস আলম গ্রুপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং বিচার প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে। তবে কোনো কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের অর্থনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আইন লঙ্ঘন করে কাউকে ঋণ দিচ্ছে না। আইনে পুনঃতফসিলের সুযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে সেই সুবিধা নিতে পারবে। তবে দুর্নীতির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে বিচার চলবে।
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে আবদুল হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের মধ্যে ঋণখেলাপির দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্যতম শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার দাবি, এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
তিনি জানতে চান, সরকার এসব ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে বিশেষ ঋণের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না এবং এর ফলে বিদেশি ঋণদাতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হবেন কি না।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, জনগণের মাথাপিছু ঋণের চাপ কমাতে সরকার রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারি অর্থের দক্ষ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও শৃঙ্খলিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণের প্রয়োজন কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় আরও সাশ্রয়ী ও কার্যকর করা এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়নের চাহিদা কমানোর চেষ্টা চলছে।
মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা
কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।
তিনি বলেন, জনগণের ওপর ঋণের বোঝা কমাতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবহার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি নিজস্ব আয় বাড়িয়ে ঋণের প্রয়োজন কমানো এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়নের চাহিদা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০১০-২০২৪ সময়ে বিদেশি ঋণ ৮১.৮৩ বিলিয়ন ডলার
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু জানান, ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ থেকে মোট ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার আসল এবং ৬ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধ করা হয়েছে।
এ সময় তিনি আরও জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
১৪ লাখের বেশি কৃষকের ঋণ মওকুফ
চুয়াডাঙ্গা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে।
এ বাবদ ব্যাংকগুলোর পাওনা হিসেবে সরকার ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে।
চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২,৫১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম স্বর্ণ এবং ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রৌপ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
ইন্টারনেট বন্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ও ডিজিটাল লেনদেন
ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, ২০২৪ সালের ১৮ থেকে ২৩ জুলাই এবং ৫ আগস্ট সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তা ও নারী কর্মী সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েন।
তিনি বলেন, ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়াসহ জুলাই-আগস্টের সংগঠিত গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলছে।