
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ জুন শেষে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন—মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পুনঃতফসিলের সুযোগ বাড়ানো, ডাউন-পেমেন্টের শর্ত সহজ করা এবং খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশে। মার্চ শেষে এ হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।
তিন মাসে বাড়ল প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে তা আরও বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জুন শেষে এ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে।
চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা কমে গিয়ে একের পর এক ঋণ খেলাপিতে পরিণত হচ্ছে বলে পরিস্থিতি থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ পুনঃতফসিলেও থামেনি খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে প্রায় এক বছর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ঋণ পুনঃতফসিলের একটি প্যাকেজ চালু করেছিল। তবে সেই উদ্যোগও খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে পারেনি।
আগের সুবিধা নেওয়া অনেক ঋণগ্রহীতা আবার খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি আরও নমনীয় শর্তে দ্বিতীয়বারের মতো বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধার মেয়াদ বাড়িয়েছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঘোষিত বিশেষ সুবিধার আওতায় প্রায় ৩০০ জন ঋণগ্রহীতা তাঁদের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল অথবা পুনর্গঠন করেছিলেন। ওই প্যাকেজের আওতায় দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ১০ বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছিল।
তবে আগের সুবিধা পাওয়া অনেক গ্রাহক এখনো দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যেই রয়েছেন। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন প্যাকেজে তাঁদের আবারও আবেদন করার সুযোগ দিয়েছে।
১,০০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণে আরও দীর্ঘ সময়
গত ৩১ আগস্ট ঘোষিত নতুন প্যাকেজে আগের তুলনায় শর্ত আরও সহজ করা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় যেসব গ্রাহকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১,০০০ কোটি টাকার বেশি, তারা দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন। একই সঙ্গে ঋণ পুনর্গঠনের সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে দুই বছর পর্যন্ত পুনর্গঠনের সুযোগ ছিল, এখন তা বাড়িয়ে চার বছর করা হয়েছে।
কেন আবার সুবিধা বাড়াল বাংলাদেশ ব্যাংক
নতুন করে পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী।
তিনি বলেন, আগের সুবিধা দেওয়ার পর থেকেই শিল্প খাত একের পর এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।
শাহরিয়ার সিদ্দিকীর ভাষায়, "আগের সুবিধাটি দেওয়ার পর দেশ গ্যাস সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের দামেও প্রভাব পড়েছে। একাধিকবার অর্থনীতি চাপের মুখে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতে।"
তিনি আরও বলেন, "শিল্পগুলো চাপে পড়ার কারণে তাদের স্বাভাবিক নগদ অর্থপ্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) ব্যাহত হয়েছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তা জানান, আগের সুবিধা পাওয়া অধিকাংশ খেলাপি গ্রাহক এখনো তাঁদের গ্রেস পিরিয়ডের মধ্যেই রয়েছেন।
তিনি বলেন, "তাই মূল বিষয় হলো—তারা যাতে ভবিষ্যতে কোনো চাপের মুখে না পড়েন, সেই বিষয়টিকে আগেভাগেই সহজ করার জন্যই এই নতুন ব্যবস্থা আনা হয়েছে।"
চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসায়ী সমাজও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পুনঃতফসিল সুবিধা আরও বিস্তৃত করার অনুরোধ জানিয়েছিল বলে জানান শাহরিয়ার সিদ্দিকী।
পুনঃতফসিলের পরও আবার বেড়েছে খেলাপি ঋণ
পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের অনুপাত সাময়িকভাবে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে নামিয়ে আনতে পেরেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
কিন্তু ওই সুবিধা নেওয়া ঋণগ্রহীতাদের অনেকে পরবর্তী সময়ে কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। এর ফলে ২০২৬ সালের মার্চেই খেলাপি ঋণের অনুপাত আবার বেড়ে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে উঠে যায়।
এর তিন মাস পর জুন শেষে এই অনুপাত আরও বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ হয়েছে।
শিল্প খাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা
খেলাপি ঋণের চাপ কমানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতকে পুনরুদ্ধার ও সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প সুদের ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি ফিরলে গ্রাহকদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বাড়বে। এর ফলে ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে আসতে পারে।
দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংক এই প্রণোদনা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
ইতোমধ্যে নতুন রিফাইন্যান্সিং স্কিমের আওতায় ঋণ বিতরণের জন্য বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এই প্যাকেজের অধীনে গ্রাহকেরা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। বর্তমানে বাজারে ব্যাংক ঋণের গড় সুদহার ১০ শতাংশের ওপরে রয়েছে।