
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের চলমান সংকট কাটাতে সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটে দেশের মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ আড়াল করার কোনো চেষ্টা সরকারের নেই। তাঁর মতে, অতীতে নেওয়া ভুল নীতির অনিবার্য ফল এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবেই বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলীয় (জামায়াতে ইসলামী) সদস্য মো. নুরুল ইসলামের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্যের চেষ্টা
প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। শুধু গ্যাস ব্যবহার করে এই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়।
অন্যদিকে, দেশীয় উৎসের গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। তবে পুরো গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে শিল্প ও গৃহস্থালি গ্রাহকদের সরবরাহ ব্যাহত হবে। এ কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং গৃহস্থালি—এই তিন খাতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে গ্যাস সরবরাহে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
পায়রা-মাতারবাড়ির দুটি ইউনিট দ্রুত চালুর উদ্যোগ
বর্তমানে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬১৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে। একই ক্ষমতার মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের আরেকটি ইউনিটও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
দুটি ইউনিটই দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহও কমেছে
বিগত সরকারের সময় আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তির প্রসঙ্গও সংসদে তুলে ধরেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী সেখান থেকে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে দিনের সময়ে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এলএনজি সরবরাহে ধাক্কা, স্বাভাবিক হয়েছে ৮৮ শতাংশ
দেশে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য দুটি এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটি গত ২১ জুলাই ত্রুটিগ্রস্ত হওয়ার পর সেটি মেরামতে প্রায় ২১ থেকে ২২ দিন সময় লাগে।
এতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তবে বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ৮৮ শতাংশ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগামী মাসের শুরুতেই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্প ও গৃহস্থালি গ্রাহকরাও প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাবেন। এর ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
ফার্নেস অয়েল থেকে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট
তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্তের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফার্নেস অয়েল থেকে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এসব কেন্দ্র পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট হওয়ায় এগুলো একটানা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সক্ষমতায় এসব কেন্দ্র চালানো যায়।
এই কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। উৎপাদন আরও বাড়াতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।
ফার্নেস অয়েল কেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
প্রতিমন্ত্রী জানান, বিগত সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জমে থাকা বকেয়ার কারণে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের প্রায় ৪৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এই অর্থ পরিশোধ করা হলে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু ও সাশ্রয়ে নজর
পায়রা ও মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর বিষয়ে সরকার কঠোর নজরদারি করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাত ৮টার মধ্যে বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ নির্দেশনা কার্যকর করতে নিজ নিজ এলাকায় সংসদ সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রুফটপ সোলারে মধ্যমেয়াদি সমাধানের পরিকল্পনা
মধ্যমেয়াদে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় রুফটপ সোলারকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে দেখছেন সরকার। আগামী গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুম সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন। উৎপাদনের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন তারা। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই বিদ্যুৎ উৎপাদনে সর্বোচ্চ ব্যয় হতে পারে ৮ টাকা।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে রুফটপ সোলার স্থাপনকারীরা তিন বছর পর্যন্ত উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ বিক্রি করে বিনিয়োগের বড় একটি অংশ তুলে নিতে পারবেন।
এ ছাড়া উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাস্টমস ডিউটি ও ভ্যাটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোলার প্যানেল আমদানিকারকদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার লক্ষ্যে এসআরও জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
‘ভুল নীতির কারণেই বর্তমান সংকট’
বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে গত দেড় যুগের ভুল নীতি এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবকে দায়ী করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ওই সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলেও সেগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন ব্যবস্থায়ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি। এর ফলে অনেক সময় আবহাওয়াজনিত কোনো কারণ না থাকলেও গ্রামাঞ্চলের মানুষকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে।
জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্যের অভাব এবং নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক এলাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার কারণেও সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে জানান তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হলেও কার্যকর উদ্যোগ বর্তমান সরকারের সময়েই নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
৮ থেকে ১০ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের অভিযোগ
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম তাঁর নির্বাচনী এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হওয়ার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গত ৯ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এটি চলতি বছরের সর্বোচ্চ ঘাটতি এবং গত ৫৫ বছরের মধ্যেও সর্বোচ্চ।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ কী এবং অতিরিক্ত ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা কত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব—তা জানতে চান তিনি।
‘সেপ্টেম্বরে যেন দুর্ভোগ না হয়, সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে’
জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগস্ট মাসে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে জনগণকে যে দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, অন্তত সেপ্টেম্বর মাসে যেন একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, সে জন্য সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর। তবে জনগণকে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র জানানো সরকারের দায়িত্ব। সংকট কাটাতে সরকার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দ্রুতই এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।