
চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংকে প্রশাসকও নিয়োগ দেওয়া হয়। এবার কোনো ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা প্রশাসক রাখা কিংবা পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের মেয়াদের দুই বছরের সীমা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
নিয়ম শিথিল করার এই সিদ্ধান্তের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে দুই বছরের বেশি সময় প্রশাসক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। একই সঙ্গে বাতিল করা পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ নিয়েও আর কোনো নির্দিষ্ট সীমা থাকছে না।
২০২৪ সালের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে বেশ কিছু ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। কয়েকটি ব্যাংকে বসানো হয় প্রশাসক। এখনও অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকরা দায়িত্ব পালন করছেন। আবার অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার সুবিধার জন্যই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনের নির্দিষ্ট ধারার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিতে সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকে প্রশাসক রাখার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, বিশেষ কোনো ব্যাংককে উদ্দেশ্য করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সার্কুলারে বলা হয়, “ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (১৯৯১ সনের ১৪ নং আইন) এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে এতদ্বারা সংশ্লিষ্ট সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১ (২০২৩ পর্যন্ত সংশোধিত) এর ৪৭(২) ধারায় উল্লেখিত পরিচালনা পর্ষদ বাতিল আদেশের মেয়াদ সংক্রান্ত বিধান সকল ব্যাংক-কোম্পানীর ক্ষেত্রে, সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না।’’
অর্থাৎ এখন থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(২) ধারা পরিপালন থেকে অব্যাহতি পেল বাংলাদেশ ব্যাংক।
কী আছে ৪৭(২) ধারায়?
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ নম্বর ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যকলাপ আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থি বা ক্ষতিকর বলে মনে হলে লিখিত কারণ জানিয়ে সেই পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তবে ৪৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘বাংলাদেশ ব্যাংক উপ-ধারা (১) এর অধীন প্রদত্ত আদেশের মেয়াদ সময় সময় বর্ধিত করিতে পারে, তবে বর্ধিত মেয়াদসহ উক্ত মেয়াদ দুই বছরের বেশি হইবে না।’’
এখন এই ধারা পরিপালন থেকে ছাড় পাওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংককে বিকল্প ব্যবস্থায় পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এরপর ব্যাংক খাত সংস্কারের দাবি জোরালো হলে বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে চলে আসে।
২০২৪ সালের আগস্টেই চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সাতটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্যায়ক্রমে ১২ থেকে ১৩টি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়। অনেক ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশাসক।
এসব ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।
এসব ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে পরিচালনা কার্যক্রম চালানো হয়। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকে শেয়ারধারক পরিচালকদের ফিরিয়ে আনা হয়। পরে প্রিমিয়ারসহ কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রদবদল করে উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারক পরিচালকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
পর্ষদ ভেঙে দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে শরিয়াহভিত্তিক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়।
এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাংকের প্রশাসক সরিয়ে সেগুলো সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অধীনে দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি ব্যাংককে এ প্রক্রিয়ায় নেওয়ার কাজ চলছে।
এ ছাড়া আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সাবেক পরিচালকদের কেউ কেউ ফিরেছেন। নতুনভাবে পর্ষদের নেতৃত্বে এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপ। ন্যাশনাল ব্যাংকেও উদ্যোক্তা পরিচালকদের অনেকে ফিরে এসেছেন।
অন্যদিকে ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ সরকারি মালিকানা থাকা আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন দুই সরকারি কর্মকর্তা। এখনও চেয়ারম্যানসহ তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রয়েছেন।
আর ২০২৪ সালের আগস্টে বাদ দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এখনও উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারক পরিচালকরা ফিরতে পারেননি। গত জুন পর্যন্ত স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়ে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরে সেই পর্ষদও ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তাকেই পুরো পরিচালনা পর্ষদ দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়।