
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধির গতিধারা নিয়ে একটি বড় ধরনের ধাক্কা দিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নাটকীয়ভাবে কমে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব সংস্থাটি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) পাঁচ দিনের ঢাকা সফর শেষে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই পূর্বাভাস দেয় আইএমএফের প্রতিনিধি দল, যা সরকারের প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার যেখানে সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, আইএমএফের এই হিসাব তার চেয়ে অনেক কম।
প্রবৃদ্ধির এই মন্দা ভাব অবশ্য অন্য আন্তর্জাতিক সংস্থাও আঁচ করতে পেরেছে। গত সপ্তাহে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) জানিয়েছিল, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, বিগত অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছিল ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধি নামবে ৩ শতাংশের নিচে
আইএমএফের মিশন সতর্ক করে বলেছে, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের চলমান অস্থিরতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে। তবে তারা আশার আলো দেখিয়ে বলেছে, যদি রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো যায় এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হয়, তবে মধ্যমেয়াদে অর্থনীতির গতিপথ ঘুরে দাঁড়াবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গত ১২ জুলাই আইএমএফের প্রতিনিধি দল ঢাকায় পৌঁছায়। গতকাল বৃহস্পতিবার তারা অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এক সমাপনী সেশনে অংশ নেন। এই কয়েক দিনের ধারাবাহিক বৈঠকে দেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাতের চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি সরকারের সংস্কার অগ্রাধিকারগুলো নিয়ে বিশদ কথা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশকে নতুন একটি ঋণ প্যাকেজ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা আগামী মাসগুলোতেও চলমান থাকবে। এই সম্ভাব্য ঋণের আকার, পরিধি এবং এর সাথে যুক্ত নীতিগত সংস্কারের শর্তাবলি নিয়েই মূলত পরবর্তী সময়ে দরকষাকষি হবে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া পূর্ববর্তী ঋণ কর্মসূচির পাঁচটি কিস্তি ছাড়ের পর উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে তা বাতিল করা হয়েছিল।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য: নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান রেখে সংস্কার
গতকাল সচিবালয়ে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন:
"আইএমএফের সঙ্গে কর্মসূচির ভিত্তি কী হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান বজায় রেখেই সংস্কারের কাজ পরিচালিত হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে।"
ঢাকায় আসা আইএমএফের এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইভো ক্রজনার। সফর শেষে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইভো ক্রজনার বলেন:
"বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাদের নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। তথ্য-সংগ্রহমূলক সফরের মাধ্যমে সরকারের নীতিগত পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক সংস্কারের অগ্রাধিকার এবং সক্ষমতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া গেছে। নতুন সম্ভাব্য কর্মসূচির পরিধি, ঋণের আকার এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কার অঙ্গীকার নিয়ে আগামী কয়েক মাসে আলোচনা হবে।"
ইভো ক্রজনার আরও উল্লেখ করেন:
"বাংলাদেশ এখনও রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতিজনিত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে আরও তীব্র হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে এবং ভর্তুকি ব্যয় বাড়িয়েছ। এর ফলে সরকারের সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স শক্তিশালী রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের চাপও এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।"
তাঁর দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী, সামাজিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য শুল্ক ও করের পরিধি বাড়িয়ে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে এবং ভর্তুকি নীতিকে যুক্তিযুক্ত করতে হবে। এর পাশাপাশি কর সংস্কারের ফলে নিম্ন আয়ের মানুষ যাতে সমস্যায় না পড়ে, সেজন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী জোরদার করা প্রয়োজন। তাছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় রোধ করতে কঠোর মুদ্রানীতির পাশাপাশি হিসেবি রাজস্বনীতি বজায় রাখতে হবে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, এবারের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় আলোচনা মূলত ২০২৫ সালের ‘আর্টিকেল-৪’ পরামর্শ প্রতিবেদনের নীতিগত সুপারিশগুলোকে ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে কৃষি খাতের সার এবং বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে দাম নিয়মিত সমন্বয়ের একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠানোকে উৎসাহিত করতে বর্তমানে চালু থাকা আড়াই শতাংশ নগদ প্রণোদনা ধীরে ধীরে উঠিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।