
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকা ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ধাপে ধাপে আবারও মালিকপক্ষের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দুই বছর আগে অনিয়ম, সুশাসনের সংকট ও আইনি ক্ষমতাবলে ভেঙে দেওয়া পর্ষদগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন করে শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার (১৫ জুলাই) এ প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালকদের হাতে দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্যায়ক্রমে আরও ১০টি ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি শুধু আগের মালিকদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। নতুন পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদনের আগে প্রকৃত মালিকানা, শেয়ারধারীদের যোগ্যতা, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা এবং গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়োগ দেওয়া পর্ষদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(২) ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক গঠিত কোনো পরিচালনা পর্ষদ সর্বোচ্চ দুই বছর দায়িত্ব পালন করতে পারে। ফলে যেসব ব্যাংকে এই সময়সীমা শেষ হচ্ছে, সেখানে নতুন আইনি কাঠামো অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, নতুন পর্ষদ গঠনের আগে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গত দুই বছরের আর্থিক কার্যক্রম মূল্যায়ন, দুই শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারধারীদের হালনাগাদ আল্টিমেট বেনিফিশিয়াল ওনার (ইউবিও) প্রতিবেদন সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা যাচাই এবং পর্ষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর করণীয় বিষয়ে আইনি মতামত গ্রহণ।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ ধারা অনুযায়ী যেসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছিল এবং যেগুলো রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় নেই, বর্তমানে সেই তালিকায় রয়েছে ১১টি ব্যাংক। এগুলো হলো আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ ২০২৬ ও ২০২৭ সালের বিভিন্ন সময়ে শেষ হবে। সেই ধারাবাহিকতায় আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ইতোমধ্যে ১৪ জন স্পন্সর ও শেয়ারহোল্ডার পরিচালক এবং তিনজন প্রতিনিধি পরিচালক নিয়ে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়েছে।
তবে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলেও নজরদারি কমাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে প্রতিটি ব্যাংকের হালনাগাদ কুইক রিভিউ রিপোর্ট, সিআরআর ও এসএলআরের তথ্য, আরোপিত জরিমানা, বিভিন্ন আর্থিক সূচক, এলসি ডিউ, এক্সপোর্ট ওভারডিউ এবং পরিচালনা পর্ষদ সম্পর্কিত বিরূপ পর্যবেক্ষণের তথ্য দ্রুত জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়োগ দেওয়া পর্ষদগুলোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করা হবে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের একাধিক ব্যাংকে অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত ও সুশাসনের সংকটের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নিজস্ব বোর্ড নিয়োগ করেছিল। ব্যাংক খাতে সংস্কারের অংশ হিসেবে নেওয়া সেই উদ্যোগের পর এবার আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে নতুন পর্বে প্রবেশ করছে এসব ব্যাংক।