
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় এ খাতে বরাদ্দ বেড়েছে ১৫৯৩ কোটি টাকা। বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের এ বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫০২ কোটি টাকায়।
নতুন বাজেটে প্রতিরক্ষা সার্ভিসগুলোর পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার ৭২১ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য সেবার জন্য পরিচালন ব্যয় রাখা হয়েছে ১ হাজার ৯৫৯ কোটি টাকা।
বাজেট প্রস্তাবটি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে উপস্থাপন করা হয়। এটি দেশের ৫৫তম বাজেট এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর প্রথম বাজেট।
প্রতিরক্ষা খাতকে ঘিরে বাজেটের আকার বড় হলেও অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় উঠে এসেছে, এই অর্থের কতটা অংশ আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যাবে এবং কতটা ব্যয় হবে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে—এ প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরক্ষা বাজেট শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়, বরং এটি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সীমান্ত ও সমুদ্র নিরাপত্তা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় ব্যয়।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক যুদ্ধের ধরন পরিবর্তনের কারণে ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা বাজেট কতটা প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত যুদ্ধের পাশাপাশি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার ওয়ারফেয়ার, ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার এবং ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন অব্যাহত রাখা জরুরি। বিশেষ করে ড্রোন ও অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, সাইবার প্রতিরক্ষা, এআইভিত্তিক নজরদারি প্রযুক্তি এবং বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়কে শুধু খরচ নয়, বিনিয়োগ হিসেবেও দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ।
তিনি বলেন, ‘প্রতিরক্ষা খাতের ৪২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখলে হবে না। সশস্ত্র বাহিনী দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যবহৃত অনেক সরঞ্জাম পরে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত দেয় জাতিসংঘ। ফলে এটি শুধু খরচ নয়, এক ধরনের বিনিয়োগও।’
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা, সমুদ্রসীমা রক্ষা, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ সক্ষমতা বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা বাজেটের কাঠামোতে আধুনিকায়নের অংশ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, সেটিই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।