
অসহনীয় চাঁদাবাজি ও ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনায় আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে—এমন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, এ পরিস্থিতি স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবগঠিত সরকারের কাছে ডিসিসিআই’র প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
তিনি বলেন, শিল্পনীতি বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার অভাব এবং আইন-শৃঙ্খলার দুর্বলতা, বিশেষ করে চাঁদাবাজির প্রকোপ, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে আর্থিক খাত, জ্বালানি, শিল্পায়ন, শুল্কায়ন, লজিস্টিক অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, এলডিসি উত্তরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুলে ধরেন তাসকীন আহমেদ।
তিনি জানান, অপরিবর্তিত পলিসি রেটের ফলে ব্যবসায়ীদের ১৬-১৭ শতাংশ সুদে ব্যাংক ঋণ নিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং ঋণ শ্রেণিকরণের সময়সীমা ৯ মাস থেকে ৩ মাসে নামিয়ে আনার কারণে আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা শিল্প খাতেও প্রভাব ফেলছে।
গ্যাস সরবরাহ সংকটের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। শিল্প-কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়া এবং নতুন শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৪০ ও ৪২ টাকা বাড়ানোয় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ ও রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামগ্রিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশন না থাকায় ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন ডিসিসিআই সভাপতি। অনেক ব্যক্তি করজালের বাইরে থাকায় সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং রাজস্ব আহরণে গতি কমে যাচ্ছে।
লজিস্টিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা ও উচ্চমূল্য, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ–এর বিভিন্ন সেবার হার গড়ে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের কার্যকর ব্যবহার না থাকায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। এতে উৎপাদন ও বিতরণ খরচ বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
এলডিসি উত্তরণ প্রসঙ্গে তাসকীন আহমেদ বলেন, আঙ্কটার্ডের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানি ৫.৫-৭ শতাংশ কমতে পারে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় রপ্তানিতে এমন নেতিবাচক প্রবণতা কাম্য নয়। তাই এলডিসি উত্তরণ কমপক্ষে তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তার মতে, এর ফলে তৈরি পোশাক খাতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হবে না। পাশাপাশি এলএনজি ও অন্যান্য পণ্য আমদানিতে শর্ত আরোপের কারণে ব্যবসা ব্যয় বাড়তে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে পুনরায় আলোচনা করে চুক্তির শর্ত সংশোধনের জন্য নতুন সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।
প্রশ্নোত্তর পর্বে তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশে প্রায় ২০ লক্ষাধিক শিক্ষিত তরুণ বেকার। কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তরুণদের শুধু চাকরিনির্ভরতা কমিয়ে দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ সহজ করার জন্য সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে ডিসিসিআইয়ের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মানসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।