
ফুটবল মাঠে নেইমারের জাদু, রাস্তাজুড়ে সাম্বার ছন্দ আর রঙিন কার্নিভালের উচ্ছ্বাস। এই পরিচিত ছবির আড়ালে ব্রাজিলে অতি নিভৃতে ঘটছে আরেকটি পরিবর্তন। খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে ইসলামের উপস্থিতি, বাড়ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা এবং সামাজিক প্রভাব।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে মুসলিমরা এখনও সংখ্যালঘু। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা অভিবাসীরাই নয়, স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের মধ্যেও ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে দেশটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং স্থানীয় ইসলামিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্রাজিলে মুসলিম জনসংখ্যা কয়েক লাখ থেকে প্রায় ১৫ লাখ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। সরকারি আদমশুমারিতে এই সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা গেলেও ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
দেশজুড়ে গড়ে ওঠা মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো মুসলিমদের ধর্মীয় জীবনের প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। বর্তমানে ব্রাজিলে ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় মসজিদ রয়েছে। এর মধ্যে সাও পাওলোর ঐতিহাসিক ‘মেসকিতা ব্রাজিল’, ফোজ দো ইগুয়াসুর ‘ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদ’ এবং কুরিতিবার ‘ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদ’ উল্লেখযোগ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্প্রসারণের পেছনে রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একদিকে লেবানন, সিরিয়া ও ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইসলামিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং মুসলিম কমিউনিটির বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানার সুযোগ বাড়ছে। ফলে অনেক ব্রাজিলীয় ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী হচ্ছেন।
সাও পাওলো, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, কুরিতিবা এবং ফোজ দো ইগুয়াসুর মতো বড় শহরগুলোতে মুসলিমদের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি। এসব এলাকায় মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং হালাল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা সম্প্রদায়টির সামাজিক অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হালাল মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ব্রাজিল আন্তর্জাতিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ মুসলিমদের জন্য ইসলাম চর্চার সুযোগ আরও বিস্তৃত করেছে।
একসময় যেখানে ব্রাজিলে ইসলামকে মূলত অভিবাসীদের ধর্ম হিসেবে দেখা হতো, সেখানে এখন চিত্র বদলাচ্ছে। ফুটবল, সাম্বা আর কার্নিভালের পরিচয়ের পাশাপাশি দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ইসলামও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিলের সামাজিক বাস্তবতায় ইসলামের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।