
২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার চুক্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জড়ো করা। এরপর সীমান্তের নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছে দেওয়া—সব শেষে সুযোগ বুঝে রাতের আঁধারে ভারতে পাচারের চেষ্টা।
পঞ্চগড় সীমান্তে সাম্প্রতিক একের পর এক আটকের ঘটনায় সামনে আসছে মানব পাচারের এমনই একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা। গত ১০ দিনে পৃথক তিন ঘটনায় চার রোহিঙ্গাসহ ১০ জনকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আটক ব্যক্তিদের কেউ এসেছেন কক্সবাজার থেকে, কেউ ফেনী কিংবা সুনামগঞ্জ থেকে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, চাকরি ও ভালো আয়ের প্রলোভন কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে পুঁজি করে প্রথমে তাঁদের টার্গেট করা হয়। পরে দালালদের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে দায়িত্ব নেয় স্থানীয় পাচারকারী চক্র।
তদন্ত ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই চক্রের শিকড় শুধু পঞ্চগড়েই সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সীমান্তের ওপার পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে তাদের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক।
সাম্প্রতিক অভিযানে আটক ছয় বাংলাদেশির বাড়ি কক্সবাজার, ফেনী, সুনামগঞ্জ ও পঞ্চগড় জেলায়। তাঁদের ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যও ছিল ভিন্ন ভিন্ন।
কেউ চাকরির সন্ধানে, কেউ স্পা সেন্টারে কাজের উদ্দেশ্যে, আবার কেউ এলাকায় বিয়ে করে অন্য নারীকে নিয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা দালালদের মাধ্যমে প্রথমে এসব ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সীমান্তে পৌঁছানোর পর দায়িত্ব নেয় স্থানীয় পাচারকারী চক্র।
অর্থাৎ দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষকে নির্দিষ্ট সীমান্ত এলাকায় এনে একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারতে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল।
মানব পাচারের সময় আটক হওয়া ব্যক্তিদের একজন সঞ্জিদ কুমার রায় (২৩)। আটকের পর তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় এসেছিলেন তিনি।
সঞ্জিদ জানান, নারায়ণ নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৭০ হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। চক্রের সদস্যদের কথামতো তাঁরা সীমান্ত এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। তবে সীমান্ত অতিক্রমের আগেই বিজিবির হাতে আটক হন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অবৈধভাবে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধারণত একজনের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। তবে ব্যক্তি, গন্তব্য ও পরিস্থিতিভেদে এই টাকার পরিমাণ বাড়তে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানব পাচারকারী চক্রটি কয়েকটি স্তরে কাজ করে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় থাকা সদস্যরা প্রথমে চাকরি, ভালো আয়ের সুযোগ কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের প্রলোভন দেখিয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁদের সীমান্ত এলাকায় নিয়ে আসা হয়। সীমান্তে পৌঁছানোর পর দায়িত্ব নেয় স্থানীয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র।
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, একটি পাচারের ঘটনায় ১০ থেকে ১২ জন পর্যন্ত সদস্য বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকতে পারে। কেউ সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, কেউ পাচারের শিকার ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আসে, আবার কেউ সীমান্তের ওপারে থাকা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে।
চক্রটির সঙ্গে ভারতের অংশেও সদস্য থাকার অভিযোগ রয়েছে। সীমান্তের দুই পাশের সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সুযোগ বুঝে পাচারের চেষ্টা চালানো হয়।
পঞ্চগড়ের কয়েকটি সীমান্ত এলাকায় বিস্তীর্ণ চা-বাগান থাকায় সেই পরিবেশও কাজে লাগানোর অভিযোগ রয়েছে পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে।
বিজিবি ও স্থানীয় সূত্র বলছে, পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকার বিপরীতে ভারতের উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। সীমান্ত পার হওয়ার পর দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় চলে যাওয়ার সুযোগ থাকায় পাচারকারীদের কাছে এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পঞ্চগড় সীমান্তের কাছাকাছি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জ ব্লকের বিভিন্ন এলাকা অবস্থিত। এসব এলাকা উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ও রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
সীমান্ত পার হওয়ার পর দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকায় পাচারকারীরা এই রুট ব্যবহার করছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকার কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মানব পাচারের ঘটনায় বিজিবির করা মামলাতেও একাধিক ব্যক্তির নাম এসেছে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফরহাদ হোসেন বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের ধরতে পঞ্চগড় জেলা পুলিশ, সদর থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডি সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘যারা এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সকেও জানানো হয়েছে। বিষয়টি আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে জেলা পুলিশ।’
৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইফুর হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যখনই কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালিয়ে পাচারের সঙ্গে জড়িতদের আটক করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। সীমান্তের টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।’
পঞ্চগড় সীমান্তে সাম্প্রতিক আটকের ঘটনাগুলো এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সংগ্রহ করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সীমান্তে নিয়ে আসা হচ্ছে। এরপর স্থানীয় পাচারকারী এবং সীমান্তের ওপারে থাকা সহযোগীদের সমন্বয়ে সুযোগ বুঝে তাঁদের ভারতে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে এই চক্র পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় দালাল, সীমান্তের স্থানীয় সহযোগী এবং সীমান্তের ওপারের যোগাযোগ—পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে সমন্বিত অভিযান চালানো জরুরি।