
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু করতে দ্বিতীয় ইউনিট থেকে একটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ (PORV) স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়ার পরমাণু প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর নিরাপত্তা ভালভে বারবার ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, রূপপুরের সেফটি ভালভে ত্রুটির কারণে প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে ত্রুটি মেরামত বা বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিকল্প ভালভ স্থাপন করা সম্ভব না হলে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার সময় আরও অনির্দিষ্ট হয়ে পড়তে পারে।
রিঅ্যাক্টরের প্রেসারাইজারে থাকা PORV-তে একাধিকবার ত্রুটি ধরা পড়ায় এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমে অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ভালভটি রিঅ্যাক্টরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা উপাদান।
রসাটমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান JSC ASE বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের জানিয়েছে, সমস্যাটির সমাধান প্রযুক্তিগতভাবে বেশ জটিল। রূপপুরের নির্দিষ্ট রিঅ্যাক্টর নকশা অনুযায়ী ভালভটি তৈরি হওয়ায় সাধারণ বাণিজ্যিক বাজার থেকে একই ধরনের ভালভ কিনে এনে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।
এ পরিস্থিতিতে ইউনিট-২ থেকে ভালভটি ইউনিট-১-এ স্থানান্তরের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে এর ফলে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনিতেই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ইউনিট-২-এর নির্মাণ ও কমিশনিং কার্যক্রম পিছিয়ে আছে।
গত ১৭ আগস্ট ঢাকার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে সরকারের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, রুশ পক্ষ জানিয়েছে—ইউনিট-১-এর প্রেসারাইজার PORV-এর পরীক্ষা পাঁচ সপ্তাহ ধরে কয়েক দফা ব্যর্থ হয়েছে। সমস্যা সমাধানে ভালভটির প্রধান নকশাবিদ বর্তমানে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন।
রুশ কর্মকর্তারা জানান, ভালভটি রিঅ্যাক্টরের নকশার সঙ্গে বিশেষভাবে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। অতিরিক্ত নকশাবিদ আনা হলেও ভিন্ন ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। বাজারে উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় বিদ্যমান সরঞ্জামকে পুনরায় সমন্বয় করাই আপাতত প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত খোজিন জানান, সরঞ্জামটি ৫০ থেকে ৬০ বছর ব্যবহারের উপযোগী করে নকশা করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কাঠামোগত শক্তি, স্থায়িত্ব ও সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
চলমান বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন সমস্যা সমাধানে একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানান।
এ সময় রুশ পক্ষ প্রযুক্তিগত সমন্বয় ও মূল্যায়নের জন্য আরও তিন থেকে চার দিন সময় চেয়েছিল। রাষ্ট্রদূত খোজিন বাংলাদেশের উদ্বেগ মস্কোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে তুলে ধরে দ্রুত ফলাফল জানানো হবে বলে আশ্বাস দেন।
PORV-এর ত্রুটিই রূপপুরের প্রথম ইউনিটের একমাত্র অসম্পন্ন কাজ নয়। কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট-১-সংশ্লিষ্ট ৫৮টি স্থাপনার মধ্যে ৪৭টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর অস্থায়ী হস্তান্তর ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশি পক্ষ PORV সমন্বয়ের পাশাপাশি প্রথম ইউনিটের অন্যান্য অসম্পন্ন কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জবাবে রুশ পক্ষ বাকি কাজ শেষ করার জন্য বাস্তবসম্মত সময়সূচি প্রণয়ন এবং আরও একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের এপ্রিলে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার কথা। তার আগে কমিশনিং প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বেশ কিছু পরীক্ষা ও পরিদর্শন শেষ করতে হবে। কিন্তু এসব কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়সূচির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক জানান, ইউনিট-১-এর জন্য বরাদ্দ কিছু সরঞ্জাম—স্পেয়ার সরঞ্জামসহ—ইউনিট-২-এর কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম এখনো পুনরায় সরবরাহ করা হয়নি। ফলে সেগুলো নতুন করে সরবরাহ, স্থাপন ও কমিশনিং করতে হবে।
সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, ইউনিট-২ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে অস্থায়ীভাবে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
সরঞ্জাম প্রতিস্থাপন, অসম্পন্ন কাজ শেষ করা এবং ইউনিট-২ হস্তান্তর—সবকিছু মিলিয়ে একটি সমন্বিত সময়সূচি তৈরিতে সম্মত হয়েছে রুশ পক্ষ।
অন্যদিকে বাংলাদেশ অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পাশাপাশি স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে। এর মাধ্যমে বিলম্বের মূল কারণ চিহ্নিত করে ইতোমধ্যে হারানো সময় কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, সেই পথ বের করার কথা বলা হয়েছে।
রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন। প্রয়োজনে আরও বিশেষজ্ঞকে চার্টার ফ্লাইটে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিশেষ করে ইউনিট-১-এর ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিংয়ের কাজ এবং ইউনিট-২-এর প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দুই পক্ষ জ্যেষ্ঠ কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছে। রুশ পক্ষের কারিগরি মূল্যায়ন শেষ হওয়ার পর আরও একটি ভার্চুয়াল বৈঠকের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বাংলাদেশের কম-কার্বন বিদ্যুতের অন্যতম বড় উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির মূল প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
তবে ইউনিট-১-এর সেফটি ভালভের সর্বশেষ জটিলতা দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর সময়সূচিকে আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।