
কুমিল্লার লাকসামে সম্পত্তি বিরোধকে কেন্দ্র করে গ্রাম্য সালিশির সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে মাইকিং করে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী চার পরিবারের নারী-পুরুষ, শিশু ও কিশোরসহ সব সদস্য গৃহবন্দি হয়ে দিন কাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন লাকসাম থানার ওসি কাজী কামরুন নাহার লাইলী। তিনি জানান, জায়গা সংক্রান্ত বিরোধ গ্রাম্য সালিশির মাধ্যমে সমাধানের জন্য উভয়পক্ষের লোকজনকে নিয়ে একাধিকবার সালিশ বসে। এ বিষয়ে পুনরায় সালিশ বসার সিদ্ধান্তও হয়। এর মধ্যে এক পক্ষ আদালতে মামলা দায়ের করে।
ওসি বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় মাইকিং করে এক পক্ষকে সমাজচ্যুত করা হয়েছে—এমন একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পান তিনি। পরে খবর নিয়ে মঙ্গলবার সকালে ওই এলাকায় পুলিশ পাঠানো হয়। ঘটনাটির সত্যতা যাচাই ও পরিস্থিতি পরিদর্শন করা হয়। বুধবার উভয়পক্ষের লোকজনকে থানায় আসার জন্য বলা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ইছাপুরা গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের ছেলে মমিন আলীর সঙ্গে একই গ্রামের মৃত আবদুর রশিদের ছেলে আলমগীর হোসেনের সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ চলছিল। জমি নিয়ে বিরোধ কোনোভাবেই মীমাংসা না হওয়ায় গ্রাম্য মাতবররা একাধিকবার সমাজে সালিশ বৈঠক করেন।
সর্বশেষ চলতি বছরের ১৯ জুন উভয়পক্ষের লোকজনকে জায়গা-সম্পত্তির কাগজপত্র সংগ্রহ করে ২০ আগস্ট পুনরায় গ্রাম্য সালিশ বসার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ওই সালিশ বসার আগেই গত ২ জুলাই মৃত আবদুর রহমানের ছেলে মমিন আলী বাদী হয়ে আলমগীর হোসেন, অহিদুর রহমান ও নেছার আহমেদ টুটুলকে আসামি করে কুমিল্লার আদালতে মামলা দায়ের করেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এবং সমাজের সালিশি সিদ্ধান্ত অমান্য করার অভিযোগে সোমবার (১০ আগস্ট) চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয় সমাজ কমিটির লোকজন। এ নিয়ে মাইকিংও করা হয়। মাইকিংয়ের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা হলে সেটি ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো সমাজে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ভিডিওতে শোনা যায়, ‘একটি জরুরি বিজ্ঞপ্তি, এতদ্বারা জানানো যাচ্ছে যে, ইছাপুরা উত্তর পাড়া হাজী আবদুর রহমানের পরিবারের সব সদস্যদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাকের পিতা মমিন আলী, হাসানের পিতা আবুল খায়ের আবু, আবদুর রশিদ ও কোরবানিসহ সব সদস্যরা বর্তমানে সমাজ কমিটির বিচার-আচার মানে না,...অমান্য করে। সমাজের আইনশৃঙ্খলা অবজ্ঞা আইন অমান্য করা কারণে এদেরকে সমাজের সব কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এবং সমাজচ্যুত করা হয়েছে। এবং সমাজের সব সাধারণ জনগণের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য, লেনদেন করা ও তাদের সঙ্গে দোকানে চলাফেরা না করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। আদেশক্রমে ইছাপুরা পূর্ব ও পশ্চিম পাড়া দুই সমাজের কমিটির নেতৃবৃন্দ।’
ভুক্তভোগী মমিন আলী বলেন, মাইকে ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে দোকানদাররা তাদের কাছে কোনো কিছু বিক্রি করছেন না। এমনকি ছোট বাচ্চারা দোকানে গেলেও তাদের কোনো খাবার কিনতে দেওয়া হচ্ছে না। এখনো বিভিন্ন ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি থানায় জানানো হয়েছে। পাশের সমাজের লোকজন বিষয়টি মীমাংসা করার কথা জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত আলমগীর হোসেন বলেন, তার সঙ্গে মমিন আলীর সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সত্য। বিষয়টি সমাজের মাতবররা দেখবেন। তবে মমিন আলীর চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করার জন্য তিনি মাইকিং করেননি। ইছাপুরা পূর্ব ও পশ্চিমপাড়ার দুই সমাজের কমিটির লোকজন এই ঘোষণা দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন আলমগীর।
সমাজের মাতব্বর মনির হোসেন বলেন, মমিন আলী ও আলমগীর হোসেনের মধ্যে জায়গাসংক্রান্ত বিষয়ে একাধিক গ্রাম্য সালিশ হয়েছে। বিরোধ সমাধানের জন্য আগামী ২০ আগস্ট আবারও সালিশ বসার কথা রয়েছে। কিন্তু মমিন আলী সমাজের লোকজনের সিদ্ধান্ত অমান্য করে আদালতে মামলা করেছেন। মমিন আলীর চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করে মাইকে ঘোষণা দেওয়ার ঘটনাকে তিনি খুবই দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন।
ইছাপুরা ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি রফিক সর্দার বলেন, আগামী ২০ আগস্ট সমাজে সালিশির মাধ্যমে আলমগীর ও মমিন আলীর দুই পক্ষের লোকজন পছন্দের দুইজন করে প্রতিনিধি জুড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু মমিন আলী সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে আদালতে মামলা করেছেন। তবে মমিন আলীর চার পরিবারের সদস্যদের সমাজচ্যুত করে মাইকিং করার বিষয়টি তার জানা নেই।