গাইবান্ধায় শত কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মাণাধীন নয়টি সেতুর কাজ প্রায় আড়াই বছর ধরে থমকে আছে। কোথাও পিলার ও সুপারস্ট্রাকচার নির্মাণের পর কাজ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও এখনো নির্মাণই শুরু হয়নি। এতে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থের প্রকল্প অনিশ্চয়তায় পড়েছে, অন্যদিকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়বে এবং অব্যবহৃত অবস্থায় নির্মিত অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘জরাজীর্ণ, অপ্রশস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিদ্যমান বেইলি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন (রংপুর জোন)’ প্রকল্পের আওতায় জেলায় তিনটি প্যাকেজে মোট ১১টি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৬৮০ দশমিক ৭৩ মিটার এবং প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১১৬ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও মাত্র দুটি সেতুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে একটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও বাকি নয়টি এখনো ব্যবহার অনুপযোগী।
প্রথম প্যাকেজে পলাশবাড়ী-ঘোড়াঘাট সড়কের করতোয়া নদীর ওপর এবং সাদুল্লাপুর-নলডাঙ্গা সড়কের ঘাঘট নদীর ওপর দুটি সেতু নির্মাণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ২০২২ সালের ২ অক্টোবর কাজ শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে করতোয়াপাড়া সেতুর কাজ শেষ হয়ে যান চলাচল শুরু হলেও জামুডাঙ্গা সেতুর মূল কাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও এখনো সংযোগ সড়ক তৈরি হয়নি।
দ্বিতীয় প্যাকেজে ছয়টি সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ৬২ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জেলা শহরের নিউ ব্রিজ এলাকার ঘাঘট-২ সেতু এবং গোবিন্দগঞ্জের শাকদহ সেতুর মূল কাঠামো নির্মিত হলেও সংযোগ সড়ক হয়নি। মাঠেরহাট এলাকায় পাইলিংয়ের পর কাজ বন্ধ রয়েছে। আর বাজারপাড়া, হলহলিয়া ও কদমতলি এলাকার তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি।
তৃতীয় প্যাকেজে সাঘাটা উপজেলার বাজিতনগর, কালিতলা এবং সদর উপজেলার পুলবন্দি এলাকায় তিনটি সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ২৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। ২০২২ সালের ২ নভেম্বর শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে বাজিতনগর সেতুর কাজ নতুন করে শুরু হয়েছে। পুলবন্দি সেতুর কাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক হয়নি। কালিতলা সেতুর কাজও এখনো শুরু হয়নি।
সরেজমিনে শাকদহ, পুলবন্দি, নিউ ব্রিজ ও জামুডাঙ্গা এলাকায় দেখা গেছে, নির্মিত সেতুগুলোর দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও লোহার রডে মরিচা ধরেছে, কোথাও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে সেতুর প্রবেশমুখ। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো সেতু ব্যবহার করছেন।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার শাকদহ এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেন বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য নির্মিত সেতু এখন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
একই এলাকার শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা নতুন সেতুর লোহার রড কেটে নিয়ে যাচ্ছে।
গাইবান্ধা শহরের অটোরিকশাচালক হুমায়ুন মিয়া বলেন, নতুন সেতু চালু না হওয়ায় নিউ ব্রিজ এলাকার পুরোনো সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। দ্রুত নতুন সেতু চালু না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
ট্রাকচালক আশরাফুল আলমের ভাষ্য, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নতুন সেতুগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পুরোনো সেতুগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
গাইবান্ধা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ১১টির মধ্যে চারটি সেতুর কাজ শুরু করা যায়নি। ২০২৫ সালের ৩ জুন ভূমি অধিগ্রহণের ৭ ধারার নোটিশ জারি হয়েছে এবং বর্তমানে প্রাক্কলন তৈরির কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে পরবর্তী ধাপের নোটিশ জারি ও ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে। এরপর দ্রুত বাকি কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, যেসব সেতুর নির্মাণকাজ বিভিন্ন পর্যায়ে আটকে আছে, সেগুলোর কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট তিনটি প্যাকেজের ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একজনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায় এবং অন্য দুজন ফোন রিসিভ করেননি।