
মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে মাছ ধরে ফেরার পথে অপহৃত দুই বাংলাদেশি জেলে ১৪ দিন পর দেশে ফিরেছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা তাদের মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিয়ে গিয়ে নির্জন একটি বাড়িতে আটকে রেখে ধারাবাহিকভাবে শারীরিক নির্যাতন চালায়। পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণকারীরা প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। পরে পরিবারের সঙ্গে দর-কষাকষির পর ৫ লাখ টাকা নেওয়ার পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়। উদ্ধার হওয়ার পর বিজিবি তাদের সীমান্ত এলাকা থেকে নিয়ে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে দুই জেলেকে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। নির্যাতনে আহত হওয়ায় তারা বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
উদ্ধার হওয়া দুই জেলে হলেন টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া ডেইলপাড়া এলাকার মোহাম্মদ কাশেমের ছেলে আব্দুর রহমান (৪২) এবং একই এলাকার রহমত আলীর ছেলে ফরিদুল আলম (৫৪)।
পরিবার ও ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ জুলাই নাফ নদীতে মাছ ধরে ফেরার সময় পালংখালী খাল ও উলুবনিয়া সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় তাদের নৌকার গতিরোধ করে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি। পরে তাদের হাত-মুখ বেঁধে জোর করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয়। একই সঙ্গে নৌকা, মাছ ও জালও ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
অপহরণের শিকার আব্দুর রহমান বলেন,
“চোখ-মুখ বেঁধে সীমান্ত পার করে একটি নির্জন বাসা বাড়িতে আটকে রাখা হয়। প্রায় প্রতিদিনই মারধর করা হয়েছে। তারা প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করলেও পরে পরিবারের সঙ্গে দর-কষাকষির পর ৫ লাখ টাকা নিয়ে আমাদের ছেড়ে দেয়।”
অপর ভুক্তভোগী ফরিদুল আলম বলেন,
“একটি ঘরে বন্দি করে রেখে পালাক্রমে নির্যাতন চালানো হয়েছে। পর্যাপ্ত খাবারও দেওয়া হয়নি। ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় নৌকায় করে নাফ নদীর শূন্যরেখার বাংলাদেশ অংশে এনে আমাদের ফেলে রেখে যায়। তখনও হাত বাঁধা ছিল। একজনের হাত খুলে দিয়ে অপহরণকারীরা মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর বিজিবির টহলদল এসে আমাদের উদ্ধার করে।”
আব্দুর রহমানের ছোট ভাই আব্দুর রশিদ দাবি করেন, প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হলেও দীর্ঘ আলোচনার পর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চার রাস্তার মোড়ে বোরকা পরা এক নারীর মাধ্যমে নগদ ৫ লাখ টাকা পৌঁছে দেওয়ার পর দুই জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সোমবার (২৭ জুলাই) সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীর হ্নীলা ও মৌলভীবাজার সীমান্ত পয়েন্টসংলগ্ন শূন্যরেখা এলাকা থেকে টহলরত উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। পরিচয় নিশ্চিত ও প্রাথমিক যাচাই শেষে তাদের টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে মঙ্গলবার ভোরে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
উখিয়া ব্যাটালিয়নের (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “হ্নীলা বিওপির টহলরত বিজিবি সদস্যরা সীমান্তের শূন্যরেখার নাফ নদীর পড়ের বাংলাদেশ অংশ থেকে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে উদ্ধার করেন। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাদের টেকনাফ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সীমান্তে অপহরণ, চোরাচালান ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে বিজিবির টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।”
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “বিজিবির মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া দুই বাংলাদেশি জেলেকে থানায় হস্তান্তর করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপহরণের ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্তসাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, নাফ নদী ও সীমান্তবর্তী এলাকায় জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা নতুন নয়। সীমান্তের ওপারভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের টার্গেট করছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, বিজিবির টহল বৃদ্ধি এবং জেলেদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।