
হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের প্রায় দুই বছর পরও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র খুলনা বেতার। বর্তমানে সীমিত পরিসরে স্থানীয় সংবাদ ও বিশেষ দিবসের অল্প কিছু অনুষ্ঠান প্রচারের পাশাপাশি অধিকাংশ সময় ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেই চলছে কেন্দ্রটি। এতে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বেতারের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ২ হাজার ৩০০ শিল্পী ও কলাকুশলী।
বেতার কেন্দ্রটি দ্রুত পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর দাবিতে শিল্পী ও কলাকুশলীরা ইতোমধ্যে মানববন্ধন করেছেন এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। কবে কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হবে, সে বিষয়েও নির্দিষ্ট সময় জানাতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এক সময় দিনভর শিল্পী, ঘোষক ও কলাকুশলীদের পদচারণা এবং বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর থাকত খুলনা বেতার। অথচ এখন কেন্দ্রজুড়ে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। হামলা ও অগ্নিকাণ্ডের ক্ষতচিহ্ন এখনো স্পষ্ট। স্টুডিও ভবন, রেকর্ডিং কক্ষ, ট্রান্সমিশন কক্ষ, আর্কাইভ, এমসিআর কক্ষসহ বিভিন্ন স্থানে পড়ে রয়েছে আগুনে পোড়া ধ্বংসাবশেষ। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি লুটপাট ও আগুনে নষ্ট হয়ে অচল হয়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের ভেতরে জন্মেছে আগাছা, আর পোড়া স্থাপনাগুলোতে বাসা বেঁধেছে মাকড়শা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় খুলনা বেতার কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কেন্দ্রটির কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুট করা হয় এবং ৫৪ বছরের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রসহ বহু মূল্যবান সংরক্ষিত সম্পদ আগুনে পুড়ে যায়। খুলনা বেতারের হিসাব অনুযায়ী, এতে ১০০ কোটিরও বেশি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ঘটনার প্রায় দুই বছর পরও কেন্দ্রটি পুরোপুরি সচল হয়নি। বর্তমানে চারটি স্থানীয় সংবাদ, বিশেষ দিবসের স্বল্প সময়ের অনুষ্ঠান এবং বাকি সময়ে ঢাকা কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন বেতারের ২ হাজার ৩০০ শিল্পী ও কলাকুশলী। তাদের অনেকেই জীবিকা নির্বাহে হিমশিম খাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন।
খুলনা বেতার চালুর দাবিতে খুলনা বেতার শিল্পী সারথির সদস্যরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন। বেতার ভবনের সামনে মানববন্ধনও পালন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নাট্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, বাচিকশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, সংবাদপাঠক, ঘোষক ও অনুবাদকসহ ২ হাজার ৩০০ কলাকুশলী দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
খুলনা বেতারের ঘোষক তানিয়া সুলতানা বলেন, “এক সময় একসঙ্গে কত শিল্পী-কলাকুশলী এই বেতার কেন্দ্রে কাটিয়েছি। কিন্তু ভাবতে পারি না গত দুই বছর ধরে বেতার কেন্দ্রটি প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এই বেতারের মাধ্যমে আমাদের সংসারটি কিছুটা হলেও চলত। কিন্তু গত দুই বছর আমরা খুবই দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছি।”
খুলনা বেতার শিল্পী সারথির সদস্যসচিব এস এম ইকবাল হাসান তুহিন বলেন, “অবিলম্বে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র খুলনা বেতার কেন্দ্রটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুসহ শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট দরকার। শিল্পীরা দীর্ঘদিন বেকার অবস্থায় থেকে পরিবার-পরিজনসহ মানবেতর জীবনযাপন করছে।”
খুলনা বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক মো. রোকনুজ্জামান জানান, গত দুই বছরে নতুন কোনো অডিশন নেওয়া সম্ভব হয়নি। শিল্পী, ঘোষক কিংবা নাট্যশিল্পী—কাউকেই অডিশনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
খুলনা বেতারের পরিচালক মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে মেশিন, যন্ত্রপাতিসহ ১০০ কোটি টাকার বেশি ভৌত অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। আমাদের শিল্পী-কলাকুশলী খাতের আগের সেই বরাদ্দ নেই।’ তিনি জানান, কেন্দ্রটি আবার পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় সব কাজের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন মিললেই বাস্তবায়ন কাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশ বেতারের প্রধান প্রকৌশলী মুনীর আহমেদ বলেন, ‘খুলনা বেতারের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। স্টুডিও ব্লক। মূল ভবনটিকে অক্ষত রেখেই ৪০০ ফুট উচ্চতার টাওয়ার নির্মাণ করা হবে।’