
একুশ শতকে দাঁড়িয়েও কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া যে কোনো নারীর জন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে, তার এক নির্মম দৃষ্টান্ত দেখল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা। ফুটফুটে দুটি জমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ায় রিনা খাতুন (২২) নামের এক তরুণী গৃহবধূকে তার স্বামী বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
পৈশাচিকতার এখানেই শেষ নয়; সদ্যভূমিষ্ঠ কন্যা শিশু দুটিকে বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে স্ত্রীর দেনমোহরের টাকা পরিশোধ করারও প্রকাশ্য হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার দাবি করেছে। উপজেলার নতুন কোলা গ্রামে এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে।
ভুক্তভোগী রিনা খাতুন উপজেলার নতুন কোলা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের ছেলে রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী।
রিনার পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে সম্পূর্ণ পারিবারিকভাবে রাকিবুলের সাথে রিনার বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের শুরুর দিকে তাদের বৈবাহিক জীবন বেশ ভালোভাবেই কাটছিল। তবে রিনা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই শ্বশুরবাড়ির লোকজনের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
রিনা খাতুনের অভিযোগ, তার গর্ভধারণের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে একটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। সেই রিপোর্টে গর্ভে জমজ কন্যাসন্তান থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই স্বামী রাকিবুল ও শ্বশুরবাড়ির অন্য সদস্যরা তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো শুরু করেন। একপর্যায়ে নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি বাবার বাড়িতে চলে যেতে বাধ্য হন, অথবা তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে বাবার বাড়িতেই অস্ত্রোপচারের (সিজার) মাধ্যমে রিনা দুটি জমজ কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে নবজাতক দুটির বয়স মাত্র দেড় মাস। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে স্বামী রাকিবুল কিংবা তার পরিবারের কোনো সদস্য শিশুদের একবারের জন্যও দেখতে আসেননি এবং তাদের চিকিৎসার খরচ বা ভরণপোষণের কোনো দায়িত্ব নেননি বলে অভিযোগ করেছেন রিনা।
নিজের ওপর হওয়া অন্যায়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে রিনা খাতুন অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলেন:
‘কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়া নাকি আমার অপরাধ। এ কারণেই আমাকে নির্যাতন করে তালাক দেওয়া হয়েছে। এখন আমার স্বামী বলছে, সন্তান দুটিকে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আমার কাবিননামার টাকা পরিশোধ করবে।’
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই অমানবিক বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসা করার জন্য এলাকার মাতব্বর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দুই দফায় সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। তবে ছেলের পক্ষের একগুঁয়েমির কারণে কোনো সুরাহা হয়নি। এর কিছুদিনের মধ্যেই রাকিবুল তার স্ত্রীকে ডাকযোগের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তালাকনামা পাঠায়।
এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত রাকিবুল ইসলামের বাড়িতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রতিবেশীদের দাবি, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এবং আইনি জটিলতার ভয়ে রাকিবুল ও তার বাবা শহিদুল ইসলাম বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
পুরো ঘটনাটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে বলেন:
‘বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। কন্যাসন্তান হওয়ার কারণে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া বা নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’