
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সরাসরি টেবিলে বসার জন্য দেশটির প্রতিনিধি দলকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তবে চিরবৈরী ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করার অর্থ এই নয় যে তেহরান শত্রুপক্ষের সব শর্ত বা অবস্থান মেনে নিয়েছে— এমন কড়া বার্তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
মোবাইল মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে প্রকাশিত এক বিশেষ লিখিত বার্তায় সর্বোচ্চ নেতা এই চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এটিই তাঁর পক্ষ থেকে আসা প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক ও সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
লিখিত বার্তায় খামেনি খোলাসা করেন যে, মার্কিন প্রশাসনের সাথে এই সমঝোতা স্মারক সইয়ের ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁর তীব্র আপত্তি ও অনীহা ছিল। তবে পরবর্তীতে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষ সুপারিশ ও অনুরোধের ওপর ভিত্তি করেই তিনি শেষ পর্যন্ত এতে সবুজ সংকেত বা অনুমোদন দিয়েছেন।
সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ও নিরাপত্তা পরিষদের নীতিনির্ধারক সদস্যরা ইরানি জনগণের মৌলিক অধিকার এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষ বা ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর স্বার্থ সমুন্নত রাখার ব্যাপারে তাঁকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। মূলত তাঁদের সেই আশ্বাসের ওপর ভরসা রেখেই তিনি এই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ট্রাম্পের ‘হতাশা’ এবং খামেনির কৌশল
এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে দিনরাত আলোচনা ও দরকষাকষিতে অংশ নেওয়া ইরানি কর্মকর্তাদের ভূয়সী প্রশংসা করেন মোজতবা খামেনি। তাঁর ভাষ্যমতে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চরম দেশপ্রেম, গভীর উদ্বেগ ও সদিচ্ছা থেকেই এই জটিল প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন। একই সাথে তিনি বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেন, সমঝোতার পক্ষে থাকা প্রতিনিধিরা তাঁকে স্পষ্ট কথা দিয়েছেন যে আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত বা অন্যায্য কোনো ছাড় দাবি করে, তবে তেহরান তা কোনোভাবেই বরদাশত করবে না।
মার্কিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে খামেনি দাবি করেন, ওয়াশিংটনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মূলত ‘হতাশা থেকেই’ শেষ পর্যন্ত এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে, এই রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের (আইএনএসএস) ইরানবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক রাজ জিম্ট আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে জানান, সর্বোচ্চ নেতা খামেনির এই নমনীয় বক্তব্যকে মূলত ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রাখার প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ সমর্থন হিসেবেই বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে এই গবেষকের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, খামেনি একই সঙ্গে অত্যন্ত সুচতুরভাবে নিজেকে এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে কিছুটা দূরে রাখার কৌশলও অবলম্বন করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো কারণে যদি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই আলোচনা বা চুক্তি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তবে তার যাবতীয় দায় ও ব্যর্থতার বোঝা যেন সরাসরি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাঁধে গিয়ে বর্তায়।
রাজ জিম্ট আরও বলেন, যদি এই আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ইরানের জন্য অত্যন্ত অনুকূল ও লাভজনক কোনো চুক্তি বের করে আনা সম্ভব হয়, তবে খামেনি অনায়াসেই এর পুরো কৃতিত্ব নিজের পকেটে পুরতে পারবেন। আর যদি উল্টোটা ঘটে অর্থাৎ চুক্তি ভেস্তে যায়, তবে তিনি এবং তাঁর অনুসারী কট্টরপন্থীরা খুব সহজেই দাবি করতে পারবেন যে তিনি মনেপ্রাণে কখনোই এই আলোচনা বা চুক্তির প্রকৃত সমর্থক ছিলেন না।
সূত্র: অ্যাক্সিওস