
ডুমুরিয়ার ভদ্রা নদী খনন থেকে উত্তোলিত পলিমাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পাশে স্তূপ হয়ে জমে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেয়ালে ফাটল, জানালা-দরজা চাপা পড়া আর মাটির চাপে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়া কাদার কারণে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক ডজন ভূমিহীন পরিবার।
বৃদ্ধ বয়সে শেষ আশ্রয় হিসেবে সরকারি ঘর পাওয়া আব্দুল হামিদ শেখ এখন নিজের ঘরেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সারাজীবন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করা এই ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি কয়েক বছর আগে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু এখন সেই ঘরের চারপাশে মাটির স্তূপে জানালা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ঘরের পেছন দিক থেকে চাপ দিচ্ছে নদী খননের মাটি।
আব্দুল হামিদ শেখ বলেন, ‘বয়স হইছে। আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। সরকার ঘর দিছিল, মনে করছিলাম শান্তিতে থাকমু। এখন ঘরের চারপাশে মাটি ফালাইয়া এমন অবস্থা করছে যে, ঘরে থাকতেই ভয় লাগে।’
একই এলাকার খর্নিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তাহমিনা বেগম জানান, ঘরের ভেতর কাদা ঢুকে গেছে। স্বামী অসুস্থ হওয়ায় ছোট সন্তানকে নিয়ে নিজেই ঘর পরিষ্কার করছেন। তিনি বলেন, ‘ঘরের পেছনের টিন ভেঙে কাদা ঢুইকা গেছে। বৃষ্টি হইলে আরও ভয় লাগে। বাচ্চা লইয়া রাতে ঘুমাইতে পারি না।’
আরেক বাসিন্দা মো. রাশেদ বলেন, নদী খননের কাজের বিরোধিতা তারা করেননি। তবে ঘরের একেবারে গা ঘেঁষে মাটি ফেলার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, ‘দেয়ালে ফাটল ধরছে। টিউবওয়েল নষ্ট হইছে। টয়লেট ভাঙা। এখন খাবার পানি আর নিরাপদ থাকার দুইটাই সংকট।’
একই প্রকল্পের রহমান সরদার বলেন, অনেকেই ঘরের জিনিসপত্র বাইরে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, এই ঘরটাই সব। এটা নষ্ট হইলে আবার রাস্তায় নামতে হবে।’
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা ও খর্নিয়া এলাকায় ভদ্রা নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে। নদী থেকে উত্তোলিত পলিমাটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের খুব কাছাকাছি স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কোথাও ঘরের দেয়াল মাটির চাপে বেঁকে গেছে, কোথাও জানালা চাপা পড়েছে। টয়লেট ও টিউবওয়েলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজিংয়ের মাটি কোথায় রাখা হবে বা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে সে বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা না থাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের পরিবারগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি, ২০ জুন এবং ২০২২ সালে তিন ধাপে শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ডুমুরিয়ার চুকনগর, খর্নিয়া ও কাঁঠালতলায় পুনর্বাসন করা হয়।
যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ পাঁচটি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আওতায় হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯৯৮ দশমিক ১৯ লাখ টাকা। এর মূল লক্ষ্য ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন।
স্থানীয়দের দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে চুকনগর এলাকায় খননকাজের সময় প্রায় ৮০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁঠালতলায় ১৪টি এবং খর্নিয়ায় আরও ২৪টি পরিবার সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক খুলনা জেলার সম্পাদক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে গৃহহীন মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অমানবিক।’
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প সমন্বয়কারী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ‘কাজটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরপরই সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে। যেসব স্থানে মাটি জমে ছিল, তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল ও অন্যান্য অবকাঠামোও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’