
সিলেটের ওসমানীনগরে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বিপণন প্রতিষ্ঠান ‘বনফুল অ্যান্ড কোম্পানি’-এর একটি শাখাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট ও বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ‘আপা’ বলে সম্বোধন করায় ক্ষিপ্ত হয়ে এই আর্থিক দণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে এমন মুখরোচক দাবিকে সম্পূর্ণ অসত্য ও মনগড়া বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক বিশেষ মতবিনিময় সভায় ইউএনও এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুনমুন নাহার আশা স্পষ্ট করে জানান, জরিমানার সাথে ‘আপা’ ডাকার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত বাসি ও নিম্নমানের মিষ্টি কেনাবেচা করা, মিষ্টি সরবরাহের চালানে বড় ধরনের অসংগতি থাকা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের আইনি কার্যক্রমে সরাসরি অসহযোগিতা করার অপরাধেই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক অভিযানের বিবরণ দিয়ে ইউএনও জানান, সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ পাওয়ার পর গত ২৯ মে তিনি নিজে একজন সাধারণ ক্রেতার ছদ্মবেশে তাজপুর বাজারে অবস্থিত বনফুলের শোরুমে যান। সেখানে প্রদর্শিত মিষ্টির গুণগত মান ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঠিক সময় সম্পর্কে জানতে চাইলে কাউন্টারে থাকা কর্মচারীরা একেক সময় পরস্পরবিরোধী ও সন্দেহজনক তথ্য দিতে থাকেন। পরবর্তীতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মূল দল সেখানে এসে পৌঁছালে শোরুমের অফিশিয়াল চালানপত্রের তথ্যের সাথে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা মিষ্টির পরিমাণের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে শোরুমের কয়েকজন কর্মী নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে নেন যে, অনেক পুরোনো বাসি মিষ্টি সাধারণ ক্রেতাদের ঠকাতে নতুন তৈরি মিষ্টির সাথে মিশিয়ে রাখা হয়েছিল। তা ছাড়া, আইনি তল্লাশি চলাকালীন সময়ে এক কর্মচারী অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে দোকান ফেলে পালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সমস্ত গুরুতর আইনভঙ্গের বিষয়গুলো আমলে নিয়েই ভোক্তা অধিকার রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
সামাজিক মাধ্যমে বহুল আলোচিত ‘আপা’ সম্বোধনের বিষয়টি পরিষ্কার করে মুনমুন নাহার আশা বলেন, “অনেকেই আমাকে আপা বলে সম্বোধন করেছেন। এটা কোনো বিষয় নয়। আমি শুধু বলেছি, আমি এখানে আপা হিসেবে নয়, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি।”
এই স্পর্শকাতর ঘটনাটি নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক জরিমানার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শোরুমের কয়েকজন কর্মচারী অপরাধের জন্য ইউএনওর কাছে আকুল হয়ে ক্ষমা চাইতে যান এবং সেই সময় তাঁরা ‘আপা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। স্বার্থান্বেষী কিছু মহল সেই স্বাভাবিক বক্তব্যকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে নিজেদের মতো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে জলঘোলা করার চেষ্টা করছে।
এ দিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ওসমানীনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও দয়ামীর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসটিএম ফখর উদ্দিন জানান, এলাকার স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিশেষ নির্দেশে তিনি নিজে এই স্পর্শকাতর ঘটনাটির সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়েছেন। তাঁর নিজস্ব তদন্ত ও অনুসন্ধানের বরাতে তিনি দাবি করেন, ইউএনও এবং বনফুলের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সাথে কথা বলে বাসি মিষ্টি বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রশাসনের দাবি, সাধারণ জনগণের খাদ্যপণ্যের সঠিক মান ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই প্রচলিত আইন অনুযায়ী এই নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। অন্য দিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘আপা’ সম্বোধনের কারণে অর্থদণ্ডের অভিযোগটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও গুজব বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা।