
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে টার্গেট করে কোরবানির পশুর হাটে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার এক বড়সড় ও ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। কক্সবাজারের টেকনাফের মুচনি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সংলগ্ন একটি সাধারণ ভাড়া বাড়ীতে গোপনে গড়ে ওঠা জাল টাকার মিনি কারখানার সন্ধান পেয়েছে তারা। সেখানে এক বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে টেকনাফ বিজিবির তিনটি দল বিপুল পরিমাণ ১ হাজার ও ৫০০ টাকার জাল নোট, জাল টাকা তৈরির আধুনিক সরঞ্জাম এবং দুটি ল্যাপটপ ও কম্পিউটার জব্দ করেছে।
আজ রোববার (২৪ মে) সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই সাড়াসি অভিযান চালানো হয়। বিজিবির তৎপরতায় জাল টাকা পাচারের সময় দুই হোতাকে হাতেনাতে গ্রেফতার করা সম্ভব হলেও আসল কারিগরেরা কৌশলে সটকে পড়েছে।
গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিরা হলেন— ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার আলাউদ্দিনের ছেলে নাজমুল হক (৩০) এবং টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা আবুল কালামের ছেলে আজিজুর রহমান (৩৬)। এদের মধ্যে আজিজুর পেশায় একজন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক (টমটম) চালক এবং নাজমুল ভাঙারি ব্যবসার সাথে জড়িত।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, কক্সবাজারে জাল টাকার চক্রের সক্রিয়তা এটিই প্রথম নয়। এর আগে গত ৬ মার্চ রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের মধ্যম মেরুংলোয়া গ্রামে বাবুল বড়ুয়ার একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়েছিল জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেখান থেকে পাঁচ লাখ টাকার জাল নোট ও সরঞ্জামসহ যশোর সদর উপজেলার খোলাডাঙ্গা এলাকার লুৎফুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ ইমরান (২৩) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যিনি গোপনে জাল টাকা তৈরির কাজ করছিলেন।
যেভাবে শনাক্ত হলো জালিয়াতির মূল আস্তানা
নজিরবিহীন এই অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া টেকনাফ-২ বিজিবির উপ–অধিনায়ক মেজর মুবাশশির নাকীব তরফদার জানান, সকালে সীমান্ত এলাকা দিয়ে জাল টাকা পাচারের খবর আসে। তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবির তিনটি দল কক্সবাজার–টেকনাফ মহাসড়কের বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে টেকনাফের মুচনি সড়কে একটি বিশেষ চেকপোস্ট বসিয়ে শুরু হয় গাড়ি তল্লাশি।
অভিযান চলাকালীন জাদিমুড়া থেকে হ্নীলাগামী একটি সন্দেহভাজন টমটমকে থামার সংকেত দিলে সেটি অমান্য করে পালানোর চেষ্টা করে। সাথে সাথে বিজিবির মোটরসাইকেল টিম ধাওয়া করে গাড়িটি আটকে ফেলে। পরে টমটমে থাকা একটি কালো ব্যাগ থেকে ১২টি বান্ডিলে মোড়ানো ১২ লাখ টাকার জাল নোট এবং আরও পাঁচ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। একই সাথে গ্রেফতার করা হয় পাচারকারী নাজমুল হক ও রোহিঙ্গা ইজিবাইক চালক আজিজুর রহমানকে।
মেজর নাকীব তরফদার আরও জানান, দুপুরে ধৃত আসামিদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে জাদিমুড়া বাজারের পূর্ব পাশে একটি টিনশেড ভাড়া বাড়ীতে হানা দেয় বিজিবি। তবে বিজিবির আসার খবর পেয়ে চক্রের মূল কারিগরেরা ঘরটি বাইরে থেকে তালা মেরে পালিয়ে যায়। পরে বিজিবি সদস্যরা ঘরের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ তৈরিকৃত জাল নোট, একটি ল্যাপটপ, একটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুটি হাইটেক প্রিন্টার, বিশেষ কালি এবং নোট তৈরির বিশেষ কাগজ জব্দ করেন।
কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এই চক্রের নাশকতার ছক নিয়ে বিজিবির উপ–অধিনায়ক বলেন, ‘পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গবাদিপশু কেনাবেচার জন্য দুষ্কৃতকারীরা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় বাজারে জাল নোট ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। গ্রেপ্তার দুজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। বিকেলে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করে মামলার প্রস্তুতি চলছে।’
বিজিবির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ধৃত আসামি নাজমুল হক স্বীকার করেছেন, তিনি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে এই ১২ লাখ টাকার জাল নোটের চালানটি নিয়ে টেকনাফের হ্নীলা বাজারে যাচ্ছিলেন। এই চালানটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারলে তাকে ১০ হাজার টাকা কমিশন দেওয়ার চুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু পথিমধ্যেই টমটমসহ তিনি বিজিবির জালে আটকা পড়েন।
রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘রোহিঙ্গা–অধ্যুষিত এলাকায় ঈদকে কেন্দ্র করে একটি চক্র জাল নোট তৈরি করে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে অনেকে প্রতারিত হচ্ছেন।’
স্থানীয় পুলিশ ও র্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুধু টেকনাফই নয়, বরং উখিয়া, রামু, চকরিয়াসহ পুরো কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন পশুর হাট ও গ্রামীণ বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নারী ও পুরুষসহ প্রায় শতাধিক অপরাধীর একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট বর্তমানে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় রয়েছে। এদের রুখতে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।