
নীলফামারীর মাঠে এখন রবিশস্য ও বোরো মৌসুমের ব্যস্ততা। আলু, গম, ভুট্টা, শাকসবজি এবং বোরো ফসলের জন্য সেচ ও পরিচর্যায় দিন কাটাচ্ছেন কৃষকরা। তবুও এই ব্যস্ততার মাঝেই তাদের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সার পাওয়া। সরকারি হিসাব অনুযায়ী জেলায় কোনো ঘাটতি নেই, কিন্তু বাস্তবে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে পারছেন না।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নীলফামারীতে সরকারি বরাদ্দ ৪৭,৫৬৯ মেট্রিক টন সার। এর আগের বছর (২০২৪-২৫) বরাদ্দ হয়েছিল ৪৯,৮১৩ মেট্রিক টন। সরকারি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কৃষকরা প্রয়োজন মতো সার পাচ্ছেন না।
কৃষকরা জানিয়েছেন, “সরকারি ডিলারদের গুদামে সার নেই বলা হলেও খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে, তবে বেশি দামে। সার না কিনলে জমিতে ফসলের পরিচর্যা বন্ধ হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।” তারা প্রশ্ন তুলেছেন, যদি সত্যিই সারের সংকট থাকে, তাহলে বাজারে সার আসে কীভাবে? “সংকটটা আমাদের জন্য, ব্যবসায়ীদের জন্য নয়।”
জেলা থেকে পাওয়া তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডোমার উপজেলার গোমনাতি ও আমবাড়ি বাজারকে কেন্দ্র করে জেলার বড় অংশের সার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নন-ইউরিয়া সারের প্রতিটি বস্তায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেন।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সরবরাহ সংকট দেখিয়ে ডিলাররা সব ধরনের সারের দাম বৃদ্ধি করেছেন। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে গোমনাতি বাজারের মধু ট্রেডার্স, ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম ও নুর আলমসহ ডোমার বাজারের কয়েকজন ডিলার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মধু ট্রেডার্স, রশিদুল ইসলাম ও নুর আলমসহ ডোমার বাজারের কিছু ব্যবসায়ী ট্রাক্টর, পিকআপ ও অটোভ্যানে হাজার হাজার বস্তা সার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠাচ্ছেন। পাশাপাশি গোমনাতি ও আমবাড়ি বাজার সংলগ্ন গুদামে বড় পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে, কিন্তু তা নিয়মিত বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, “গোমনাতি বাজারের মধু ট্রেডার্স, রশিদুল ইসলাম ও নুর আলম কেউই সরকার অনুমোদিত বিসিআইসি বা বিএডিসি সার ডিলার নন।” এছাড়া উপজেলা থেকে কালোবাজারি ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের সংক্রান্ত প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি অফিস ত্যাগ করেছেন।
পরিবহনচালক আমিনুল ও দুলাল জানান, তারা নিয়মিতভাবে এই বাজার থেকে সার সংগ্রহ করে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করেন। খোগারহাটের ব্যবসায়ী হাচানুর বলেন, “আমি প্রতিদিন গোমনাতি বাজার থেকে প্রায় ২০০ বস্তা সার পাইকারি কিনি। ডোমার, ডিমলা ও জলঢাকার আরও অনেক ব্যবসায়ী একইভাবে বেশি দামে বিক্রি করছেন।”
ডোমার, জলঢাকা ও ডিমলার অন্তত ২০ জন ব্যবসায়ীও একই দাবি করেছেন। কৃষক জাহেদ আলী, আনোয়ার, কাশেম আলীসহ অন্তত ৫০ জন জানিয়েছেন, “ডিলাররা নামমাত্র সার বিতরণ করে। বেশির ভাগ সার ব্যবসায়ীর কাছে চলে যায়, সেখান থেকে আমাদের বেশি দামে কিনতে হয়। না কিনলে জমিতে সার দেওয়া যায় না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কিছু বিক্রেতা জানিয়েছেন, বরাদ্দকৃত সার অন্য জেলায় পাচার হচ্ছে। বরাদ্দের অর্ধেক সার উত্তোলনের আগেই হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং কৃষকরা বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মূল ডিলাররা কমিশনের ভিত্তিতে বিক্রির দায়িত্ব সাব-ডিলারদের হাতে তুলে দিচ্ছেন যা নিয়মবিরুদ্ধ। সরকারি বরাদ্দের কিছু অংশ বিদেশি ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিবেদককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেন নুর আলমসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী। গোপন ক্যামেরায় বিষয়টি ধরা পড়ে। মধু ট্রেডার্সের পরিচালক রাজু স্বীকার করেছেন, তিনি প্রতিদিন ২৫০-৩০০ বস্তা সার বিক্রি করেন। নুর আলম দাবি করেন, মধু ট্রেডার্স ও রশিদুল ইসলাম প্রতিদিন প্রায় চার হাজার বস্তা সার বিক্রি করেন। তবে রশিদুল ইসলাম বলেন, “নুর আলম একাই প্রতিদিন অন্তত তিন হাজার বস্তা সার বাজারজাত করছেন।”
কালোবাজারিদের তথ্য অনুযায়ী, গোমনাতি বাজারে প্রতিদিন ১৫-২০ ট্রাক সার আনলোড হয়, যা দিনের আলোয় এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর বাজারে চলে যাচ্ছে।
তবে জেলা ডিলাররা দাবি করেন, বরাদ্দ কম থাকার কারণে সার সংকট তৈরি হচ্ছে এবং বিতরণে কোনো অনিয়ম করার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন, নীলফামারী জেলা ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সাহা বলেন, “চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। আমরা সরকারিভাবে যতটুকু বরাদ্দ পাচ্ছি, ততটুকুই বিক্রি করছি।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান ও বিএডিসির সংশ্লিষ্টরা সার সংকট নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানিয়েছেন, “নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সরকারি মজুদ থাকা সত্ত্বেও সার কৃষকের কাছে পৌঁছানো না গেলে ফসল উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রশ্ন তাই থেকেই যাচ্ছে; নীলফামারীর এই সার সংকট কি সত্যিকারের ঘাটতির ফল, নাকি কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করা বাজারের কারণে সৃষ্টি হয়েছে?