
রাতভর টানা বৃষ্টির পর সোমবার (১৩ জুলাই) সকালেও থামেনি বর্ষণ। সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসের শুরুতেই জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট এবং গণপরিবহনের সংকটে নাকাল হতে হয়েছে রাজধানীবাসীকে। ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির বিস্তীর্ণ অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও তারও বেশি পানি জমে মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১২ জুলাই) সকাল ৬টা থেকে সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, এ মাত্রার বৃষ্টিপাত ‘অতিভারী বৃষ্টিপাত’-এর মধ্যে পড়ে।
তিনি আরও জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে একদিনে ঢাকায় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড।
ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, জুলাই মাস স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপ্রবণ। তাই এ ধরনের বৃষ্টিপাত অস্বাভাবিক নয়। গত ৫ জুলাই থেকে মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টি হচ্ছে।
তার মতে, সোমবার বিকেলের পর বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ১৬ জুলাই থেকে আবারও বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। পুরো জুলাই মাসজুড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
অবিরাম বর্ষণে রাজধানীর অসংখ্য সড়ক পানিতে ডুবে যায়। মিরপুর, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, মালিবাগ, বাড্ডা, শাহজাদপুর, রামপুরা, বনশ্রী, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, পুরান ঢাকা, শান্তিনগর, গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন, কাকরাইল, গ্রিনরোড, পান্থপথ, ধানমন্ডি, শুক্রাবাদ, কলাবাগান, কালশী এবং উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। নিচু এলাকার কয়েকটি বাসাবাড়ির নিচতলাতেও পানি ঢুকে পড়ে।
সকাল ১০টার মধ্যেই বিজয়নগর, কাকরাইল, ফকিরাপুল, শান্তিনগর ও মালিবাগের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যায়। অনেক অলিগলি ডুবে থাকায় বাসিন্দাদের মূল সড়কে পৌঁছাতেই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
জলাবদ্ধতার পাশাপাশি চলমান সড়ক খোঁড়াখুঁড়িও নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। পানির নিচে গর্ত ও কাটা অংশ দেখা না যাওয়ায় পথচারীদের সতর্ক হয়ে চলতে হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ কারণে কয়েকজন আহতও হয়েছেন।
সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহনের গতি কমে যায় এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। একই সময়ে বাস, রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংকটও দেখা দেয়। অনেক যাত্রীকে হাঁটুপানি মাড়িয়ে বাসে উঠতে হয়েছে। কেউ ছাতা নিয়ে, আবার কেউ ভিজেই কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আবু ইউসুফ, যিনি কুড়িলের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, জানান সকালে দীর্ঘ সময় বাস, রিকশা ও সিএনজির অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। তার অভিযোগ, বৃষ্টির সুযোগে রিকশা ও সিএনজির ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আবার বাসের সংখ্যাও ছিল কম।
বৃষ্টির কারণে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজেও বিঘ্ন ঘটে। বিজয়নগরের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছে।
রাইড শেয়ার চালক আলম সরদার জানান, সকাল ৮টার দিকে শাহবাগ থেকে মিরপুরে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মিরপুর-১০ এলাকায় হাঁটুপানি দেখতে পান।
তবে সড়কে ভোগান্তি থাকলেও মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক ছিল। এ কারণে সচিবালয় ও মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনে অন্য দিনের তুলনায় যাত্রীদের চাপ ছিল বেশি।
জলাবদ্ধতা ও যানজটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও। নির্ধারিত সময়ে অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ও কলেজে পৌঁছাতে না পারায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
পরিস্থিতির কারণে মিরপুরের মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পূর্বনির্ধারিত অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। একইভাবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির অর্ধবার্ষিক, দশম শ্রেণির প্রাক্-নির্বাচনী এবং একাদশ শ্রেণির ব্যবহারিক পরীক্ষাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন এলাকাও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়। মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ, উপাচার্য চত্বর, গণিত ভবন, কার্জন হল, পলাশী, প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ক্লাব, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে। পাশাপাশি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল এবং শহীদুল্লাহ হলের আশপাশেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
জলাবদ্ধতা ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বাংলা এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগসহ কয়েকটি বিভাগের ক্লাসও বাতিল করা হয়েছে।