
ত্যাগ, আত্মশুদ্ধি ও পারিবারিক বন্ধনের অনন্য বার্তা নিয়ে আবারও এসেছে পবিত্র ঈদুল আযহা। দীর্ঘ একাডেমিক ব্যস্ততা, ক্লাস-পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ক্যাম্পাস জীবনের ক্লান্তি পেরিয়ে ঘরে ফেরার আনন্দে এখন মুখর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি)। ঈদ মানেই প্রিয়জনদের কাছে ফেরা, মায়ের হাতের চেনা রান্না, শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে অন্তহীন আড্ডা আর এক টুকরো মানসিক প্রশান্তি। শত ব্যস্ততা ও যান্ত্রিকতার দেয়াল ভেঙে শিক্ষার্থীদের এই ঘরমুখো হওয়া এবং ঈদকে ঘিরে তাদের নানা অনুভূতি, প্রত্যাশা ও ভাবনা নিয়ে আমাদের বিশেষ আয়োজন— “পবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা”।
কড়া নাড়ছে সেশনজট, তবুও কাটুক গ্লানি
ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ মুহসিন তানজিম তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে আনন্দের পাশাপাশি ক্যাম্পাসের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন,"বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর থেকেই ঈদ মানে অনেকদিন পর পরিবারের কাছে ফেরা আর কিছুটা স্বস্তির সময় কাটানো। তবে এবার ঈদের ছুটিতেও একটা খারাপ লাগা কাজ করছে। আমাদের চিরচেনা ক্যাম্পাস তার স্বাভাবিক গতি হারিয়েছে, শিক্ষক রাজনীতির বলি হয়ে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লাইফে এখন সেশনজটের ঘনঘটা।"
শিক্ষকদের রাজনৈতিক ব্যস্ততা কমিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় বেশি মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তানজিম আশা প্রকাশ করেন, "আশা করি ঈদের পর ক্যাম্পাস আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। ত্যাগ ও কুরবানির শিক্ষায় সবাই নিজের হৃদয়ের সব কালিমা বিসর্জন দিয়ে নতুন উদ্যমে ক্যাম্পাসে ফিরবেন।"
ক্যাম্পাস জীবনের চারদেয়াল বনাম চেনা আঙিনার পিছুটান
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন যেমন শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী হতে শেখায়, তেমনি উৎসবের দিনগুলোতে তা বাড়িয়ে দেয় চেনা আঙিনার টান। অ্যানিমেল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থী মোঃ ফারহান সাদিক মনে করেন, লেকের পাড়ে আড্ডা আর চায়ের কাপের ধোঁয়ায় দিন কাটলেও ঈদের সময় মন আর ক্যাম্পাসে আটকে থাকে না।
তাঁর ভাষায়,"ঈদুল আযহা আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তুলতে আসে। এই উৎসবের শিক্ষা কেবল ঈদের ওই কয়েকটা দিনের জন্য নয়, বরং সারা বছরের পথচলার পাথেয়। আমরা যদি সত্যিই এই উৎসবের মর্তবাকে ধারণ করতে পারি, তবে সমাজ থেকে হিংসা, অনৈক্য আর বৈষম্য দূর হবে। আসুন, শুধু পশু নয়, কোরবানি করি নিজেদের অহংকার।"
পশুত্ব বিসর্জন ও প্রাণিকুলের প্রতি মানবিকতার ডাক
ঈদের আনন্দ যেন শুধু মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ না থাকে, এই উৎসব থেকে প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী হওয়ার এক অনন্য নৈতিক বার্তা দিয়েছেন এনিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থী মাসুদা আক্তার রিফা।
তিনি বলেন, "ঈদুল আযহা নিজের ভেতরের রাগ, হিংসা ও অহংকার ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়। মানুষ হিসেবে আমরা আশরাফুল মাখলুকাত। তাই কুরবানির সময় প্রাণীদের প্রতি সদয় আচরণ করা, তাদের অযথা কষ্ট না দেওয়া এবং যথাযথ যত্ন নেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। শুধু কুরবানির পশুই নয়, রাস্তার কুকুর, বিড়ালসহ সকল প্রাণীর প্রতিই আমাদের সহৃদয় হওয়া উচিত।"
একাডেমিক অস্থিরতা ভুলে আত্মিক প্রশান্তি
ঈদের এই দীর্ঘ ছুটি শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত একাডেমিক জীবনের ক্লান্তি ভুলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের শিক্ষার্থী মেহেরুন্নেছা লাবনী কোরবানির মূল শিক্ষাকে ফুটিয়ে তুলে বলেন,"ঈদ উল আযহার মূল শিক্ষা হলো আত্মত্যাগের মাধ্যমে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভ করা। ঈদের ছুটি শিক্ষার্থীদের আবারও পরিবার ও প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে ফিরিয়ে আনে, গড়ে তোলে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন। এই পবিত্র উৎসব আমাদের ধৈর্য, সহমর্মিতা ও মহান আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের শিক্ষা দেয়।"
দূরত্বের গ্লানি মুছে এক স্বর্গীয় সুখ
ক্যাম্পাসের সাম্প্রতিক অচলাবস্থা ও টিউশনির যান্ত্রিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে ঈদের ছুটি যেন এক পশলা বৃষ্টি। এনিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান মিশু তাঁর অনুভূতি শেয়ার করে বলেন,"ক্লাস, পরীক্ষা আর টিউশনির যান্ত্রিক জীবনে মন খারাপ হলেও চাইলেই বাড়ির পানে ছুটে যাওয়া যায় না। তবে সব ক্লান্তি উপেক্ষা করে দিনশেষে যখন মায়ের কোল আর বাবার হাসিমুখের কথা মনে পড়ে, তখন এই দীর্ঘ দূরত্বের কষ্ট মুছে যায়। পুরোনো বন্ধুদের সাথে আবার সেই চিরচেনা গরুর হাটে যাওয়ার আনন্দ—সব মিলিয়ে শুরু হয় এক বাঁধভাঙা উৎসব।"
শিকড়পানে ফেরা: যান্ত্রিক ক্যাম্পাস থেকে ত্যাগের উৎসব
পরিবারের মায়া ছেড়ে বের হওয়া সন্তানেরা চাইলেও সহজে বারবার বাড়ি ফিরতে পারে না। সারাদিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, মিড ও সেমিস্টার ফাইনালের ভিড়ে এক টুকরো স্বস্তি নিয়ে আসে এই উৎসব। ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্ককে শাণিত করলেও, ত্যাগের এই উৎসব হৃদয়কে করে তোলে প্রশস্ত।
শিক্ষার্থীদের সমস্বরে একটাই প্রত্যাশা—সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বাঁধনে অটুট হোক এবারের ঈদ। সব সংকীর্ণতা ও অহংকার বিসর্জন দিয়ে, ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হোক প্রতিটি মন, প্রতিটি পরিবার এবং আমাদের পুরো সমাজ। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আযহার আন্তরিক শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক!