
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও ড্রাইভারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পেতে ৯৯৯ এ কল দিয়ে পুলিশের কাছে সহায়তা চান ট্রাক চালক।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাত ১১টার দিকে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কের তালুকদার মার্কেট এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ীর অভিযোগ, ববি শাখা ছাত্রদল নেতা মিয়া বাবুলের নেতৃত্বে ছাত্রদলের কর্মীরা কয়েকটি মোটরসাইকেলে তার মাছের ট্রাককে তাড়া করে। অবৈধ মাছ আছে বলে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। এসময় গাড়ি থামিয়ে পাশের সড়কে নিতে অস্বীকৃতি জানালে ড্রাইভারকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী। তাছাড়াও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদেরকে অবৈধ মাছ আছে বলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তীতে সেখানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানির রহমানসহ কয়েকজনের উপস্থিতর কথা বলেন তিনি। এসময় অবস্থা বেগতিক দেখে চালকের সহকারী ৯৯৯ ফোন করলে পুলিশ এবং সেনাবাহিনী এসে তাদের উদ্ধার করে সেনা হেফাজতে নিয়ে যায়।
সূত্রের বরাতে জানা যায়, এ ঘটনায় অভিযুক্তরা হলেন, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০১৮–১৯ সেশনের মিয়া বাবুল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২১–২২ সেশনের আবু হায়দার রোশান, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের ২০১৯–২০ সেশনের মিজানুর রহমান, রসায়ন বিভাগের ২০১৯–২০ সেশনের সাকিবুল হাসান, ইংরেজি বিভাগের ইমরান সহ আরও ৫–৭ জন অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাসড়কের পাশের রাস্তায় একটি মাছ বোঝাই ট্রাক ঘিরে সেনা বাহিনী, পুলিশ, মাছ ব্যবসায়ী ও চালকসহ ববি শাখা ছাত্রদল নেতা মিয়া বাবুল ও হায়দারও সেখানে উপস্থিত। এ সময় দুর্ঘটনার শিকার দাবি করা মোটরসাইকেলটিও সেখানে দেখা যায়।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মাছ ব্যবসায়ী মনির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, আমরা ভোলা চরফ্যাশন থেকে ১০ ইঞ্চির উপরে বৈধ ইলিশ মাছ নিয়ে ঢাকা যাচ্ছিলাম। মাছ গুলো ভোলা থেকে প্রশাসন চেক করেই ছাড়েন। পথিমধ্যে আমরা ভোলা বরিশাল মহাসড়কের জিরো পয়েন্ট এলাকায় আসলে শুরুতে দুইটা বাইক আমাদের পিছন থেকে তাড়া করে এবং গাড়ি থামাতে বলে।
তিনি আরও জানায়, গাড়ি না থামিয়ে টেনে আসলে পরে ৭/৮ টা বাইক আমাদের তাড়া করে তালুকদার মার্কেট বাজারে থামায়। আমরা কি হয়েছে জানতে চাইলে গাড়িতে অবৈধ মাছ আছে বলে গাড়ি ভিতরের গলিতে নিতে বলে। আমরা পুলিশ প্রশাসন ছাড়া গাড়ি ভিতরের রাস্তায় নিতে না চাইলে আমার ড্রাইভারকে চড় থাপ্পড় ও মারধর করে জোরপূর্বক গাড়ি ভিতরে প্রবেশ করায়।
ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ী জানায়, এসময় গাড়িতে অবৈধ মাছ আছে বলে সেনা বাহিনী ও পুলিশের ভয় দেখিয়ে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে, না হয় পুলিশে খবর দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে আমরা ৯৯৯ কল করি এবং পুলিশ ও সেনা বাহিনী এসে আমাদের উদ্ধার করে। তবে পুলিশ আসার পর তারা বলতে থাকে যে আমরা নাকি তাদের বাইকে ধাক্কা দিয়েছি,তাদের বাইকের নাকি ক্ষতি হয়েছে। আসলে এধরনের কিছুই হয়নি।
মোটরসাইকেলের কোনো ক্ষতি হয়নি দাবি করে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী বলেন, পুলিশ আসার প্রায় ১ ঘন্টার মধ্যেও দুর্ঘটনার শিকার দাবি করা মোটরসাইকেলটি এনে কি ক্ষতি হয়েছে দেখাতে পারেনি । পরে আমরা ঝামেলা এড়াতে পুলিশের মধ্যস্থতায় চার হাজার টাকা দিতে চাই, তবে তারা ২০ হাজারের কমে নিতে চায়নি। টাকার পরিমান নিয়ে কথা কাটার মধ্যেই সেনা বাহিনী এসে তল্লাশি চালিয়ে অবৈধ কিছু না পেয়ে আমাদের সেনা হেফাজতে নিয়ে উদ্ধার করে এবং গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়।
মারধরের শিকার ড্রাইভার মনসুর বলেন, ট্রাক থামানোর পর আমি পাশে ভিতরের দিকে ট্রাক নিতে না চাইলে আমাকে ঐসময় চড়-থাপ্পর দিয়ে মারধর করে এবং জোরপূর্বক গাড়ি ভিতরের দিকে নিয়ে যায়। পরে নানা কথা বলে চাঁদা দাবি করে।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, হায়দারের বাইকে সমস্যা হওয়ায় ট্রাক আটকালে খবর দিলে আমি যাই, চাঁদাবাজি বা মারধরের বিষয়ে আমি জানি না। একটা পদে আছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই -বন্ধুরা ডাকলে সেখানে যাওয়া লাগে, তাই গিয়েছি।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতা মিয়া বাবুল চাঁদাদাবির ঘটনা পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, আমাদেরকে ফাঁসানোর জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হচ্ছে। আপনাকে কেউ ভুল তথ্য দিয়েছে। দিনারের পুলে ট্রাকটি হায়দারের বাইকে ধাক্কা দিলে বাইকের পেছনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিগনাল দিলেও ট্রাকটি না থামিয়ে চলে যায়। পরে তালুকদার মার্কেটে ট্রাকটি আটকিয়ে পুলিশকে জানানো হয়। বন্দর থানার পুলিশ এসে বাইকের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি দেখার কথা বললেও মাছ ব্যবসায়ীরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে এসে মাছের গাড়িটি তল্লাশি করে কোনো অবৈধ কিছু পায়নি। এরপর গাড়িটি সেনাবাহিনী তাদের হেফাজতে নেয়। আমরা ক্ষতিপূরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে কিছু করতে পারবেন না বললে আমরা চলে আসি। ক্ষতিপূরণ না পেয়ে ছোট ভাইদের মধ্যে কিছুটা ক্ষোভ তৈরি হয়।
ববি ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, আমি গতকাল প্রোগ্রামে ব্যস্ত ছিলাম, চাঁদাবাজি বা মারধর এ বিষয়ে আমার জানা নাই। আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বন্দর থানার এস আই অনাদি বলেন, অঙ্গাতনামা ১০-১২ জন লোক এই ব্যবসায়ীকে আটকে চাঁদাদাবি করে এমন অভিযোগে তিনি ৯৯৯ এ কল করলে আমরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হই। তবে অভিযুক্তরা বলছেন তাদের মোটরসাইকেল নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দু'পক্ষই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করছেন। বিষয়টি আমার কাছে পরিস্কার নয়। সেনা বাহিনী আসছে আপনি তাদের সাথে কথা বলেন।
উপস্থিত সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, গাড়িতে অবৈধ মাছের যে অভিযোগ তা সত্য নয় সব মাছ ১০ ইঞ্চির বড়। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমরা গাড়িটি (নথুল্লাবাদে) হেফাজতে নিচ্ছি। সেসময় সেখান থেকে কোনো ধরনের সুরাহা ছাড়াই ছাত্র দলের নেতা কর্মীদের চলে যেতে দেখা যায়। তবে চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেন নি।