
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) রেজিস্ট্রারকে কার্যত জিম্মি করে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানোর একটি চিঠিতে অবৈধভাবে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। লিখিত জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক ও সহযোগী তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করেন। ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
গত ১১ মার্চ (বুধবার) রেজিস্ট্রারের লিখিত ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, নির্দিষ্ট একটি চিঠি রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানোর জন্য তাকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। কিন্তু চিঠির বিষয়বস্তু ও প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি থাকায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে স্বাক্ষর দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। এ সময় ড. এবিএম সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি তার কক্ষে এসে চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে রেজিস্ট্রার কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় পড়েন। লিখিত জবাবে তিনি বলেন, তার আপত্তি সত্ত্বেও জোরপূর্বক পরিস্থিতি তৈরি করে চিঠিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা—যেমন মোহাম্মদ রিয়াজ কাঞ্চন শহীদ, শাহাদাত হোসেন নান্টু, রাহাত মাহমুদ এবং আরিফুর রহমান নোমান—কে সঙ্গে নিয়ে রেজিস্ট্রার অফিসে উপস্থিত হয়ে আমাকে তার স্ব-ব্যাখ্যাত পত্রে রেজিস্ট্রার হিসেবে স্বাক্ষর করার জন্য বলে। আমি তখন জানাই যে, মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের অনুমোদন প্রাপ্তির পর বিষয়টি করা সম্ভব হবে।
কিন্তু ড. এ. বি. এম. সাইফুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে স্বাক্ষর করার জন্য জোরালো চাপ সৃষ্টি করেন এবং স্বাক্ষর না করলে আমাকে কক্ষে আবদ্ধ করে দরজায় তালা দেওয়ার হুমকি প্রদান করা হয়। এ সময় উপস্থিত কয়েকজন ব্যক্তি উচ্চবাচ্য করেন এবং বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি জনাব রিয়াজ কাঞ্চন আমার টেবিলের গ্লাসে আঘাত করে হুমকি প্রদান করেন। কেউ কেউ, বিশেষ করে আরিফুর রহমান নোমান, স্বাক্ষর না করলে আমাকে পদত্যাগ করার কথাও বলেন।”
রেজিস্ট্রারের ভাষ্যমতে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তার কক্ষে উপস্থিত হয়ে একধরনের ভয়ভীতি ও চাপের পরিবেশ তৈরি করেন। এতে তিনি স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি এবং বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করতে হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি লিখিত জবাবে বলেন, “পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্মানহানির আশঙ্কায় আমি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। এমতাবস্থায় মাননীয় ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সংযোগ স্থাপন করতে পারিনি।”
তার ভাষায়, “উদ্ভূত পরিস্থিতির চাপে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও মহামান্য রাষ্ট্রপতি বরাবর ড. এ. বি. এম. সাইফুল ইসলামের আবেদনপত্রে ভাইস-চ্যান্সেলর মহোদয়ের অনুমোদন ব্যতিরেকে রেজিস্ট্রার হিসেবে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হই।”
রেজিস্ট্রার আরও উল্লেখ করেন, কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সকলে মিলে উপস্থিত ব্যক্তিদের বোঝাতে ব্যর্থ হন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা জানান, একজন রেজিস্ট্রারকে এভাবে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর করানো শুধু প্রশাসনিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘনই নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি প্রকাশ্য অবমাননা। এবিএম সাইফুল বিগত ১৮ মাসে ১৮টি ক্লাসও নেননি। ইউট্যাবের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের দোহাই দিয়ে ক্যাম্পাসে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। তার নেতৃত্বে এ ধরনের আচরণ ক্যাডারগিরির এক স্পষ্ট উদাহরণ।
এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে অভিযুক্ত শিক্ষক এবিএম সাইফুল ইসলাম বলেন, “রিজেন্ট বোর্ডের ৩ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ভাইস-চ্যান্সেলর আমার চিঠি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাননি। সেক্ষেত্রে গত ১৯ তারিখ প্রো-ভিসি ভিসির চার্জে ছিলেন, সেদিন তার থেকে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে।”
কিন্তু ‘রেজিস্ট্রার ঐ অনুমোদনের বিষয়টি অস্বীকার করছেন’ এবং ‘১৯ তারিখে অনুমোদন হলে এতদিন চিঠি হয়নি কেন?’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রেজিস্ট্রার কী বলেছেন, সেটা তার নিজস্ব বক্তব্য। আমি রেজিস্ট্রারকে বলেছি, আপনি কোথা থেকে অনুমোদন নেবেন বা না নেবেন, সেটা আমি জানি না। আমি আমার চিঠি চাই।”
রেজিস্ট্রারের বক্তব্য অনুসারে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করানোর হুমকি, কক্ষে তালা দেওয়ার হুমকি কিংবা তার টেবিলে আঘাত করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এবিএম সাইফুল বলেন, “আমরা একসঙ্গে থাকি, অনেকে অনেকভাবে কথা বলি। এগুলো কোনো বিষয় না। তবে আমরা তাকে বাধ্য করিনি, আমরা দাবি করেছি চিঠির বিষয়ে।”
এর আগে বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অনিয়ম ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে দেওয়া লিখিত জবাবে রেজিস্ট্রারের বক্তব্য ঘটনাটিকে আরও স্পষ্ট করেছে।