
সুন্দরবনের সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালানো কুখ্যাত বনদস্যু 'সুমন বাহিনী'র প্রধান সুমনসহ সাত সক্রিয় সদস্য আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) বেলা ১১টায় কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেজবা উল ইসলামের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সমর্পণ করে এই দস্যু দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ সম্পন্ন করে।
এর আগে ২০১৮ সালেও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন এই সুমন হাওলাদার। সেই সময় তার সঙ্গে সিদ্দিক হাওলাদার নামের আরেক দস্যুও স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছিলেন। তবে বিগত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সুমনের নেতৃত্বে সিদ্দিকসহ ৭ জন আবারও সুন্দরবনের গহীনে দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন।
আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের পরিচয়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করা ৭ দস্যু হলো:
মোংলা উপজেলার সুমন হাওলাদার (৩২) — বাহিনী প্রধান
রবিউল মল্লিক (২৫)
রফিক শেখ (২৯)
সিদ্দিক হাওলাদার (৪০)
গোলাম মল্লিক (৩৮)
ইসমাইল খান (৩১)
বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার মাহফুজ মল্লিক (৩৪)
এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে ডাকাতি, জেলেদের জিম্মি এবং বাওয়ালিদের আটক করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে আসছিল।
কোণঠাসা দস্যু দল ও কোস্টগার্ডের বিশেষ অভিযান
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেজবা উল ইসলাম জানান, সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ দস্যুমুক্ত করতে কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ এবং ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ নামে দুটি পৃথক ও বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
এই সাঁড়াশি অভিযানের মুখে সুন্দরবনের বিভিন্ন জলদস্যু ও বনদস্যু বাহিনীগুলো বর্তমানে চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তীব্র চাপের মুখে পড়ে একপর্যায়ে দুর্ধর্ষ ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সঙ্গীরা কোস্টগার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৭ মে রাত ১১টার দিকে মোংলার সুন্দরবন সংলগ্ন নন্দবালা খাল এলাকায় কোস্টগার্ডের কাছে অনানুষ্ঠানিকভাবে ধরা দেয় সুমন ও তার ৬ সহযোগী। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৩টি দেশীয় একনলা বন্দুক, ২টি দেশীয় পাইপগান, ২৫ রাউন্ড তাজা গুলি এবং ৩ রাউন্ড ফাঁকা গুলি জব্দ করা হয়। পরবর্তীতে ২১ মে বৃহস্পতিবার সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দস্যু বাহিনীর আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হয়।
দস্যুদের বক্তব্য ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকুতি
পুনরায় দস্যুতায় ফেরা এবং আবার আত্মসমর্পণের বিষয়ে বাহিনী প্রধান সুমন হাওলাদার বলেন:
"এর আগে এক বছর ডাকাতি করে ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করি। এরপর ব্যবসা বাণিজ্য করে চলছিলাম। কিন্ত বিগত ৫ আগস্টের পর হামলা, মামলা ও জেল-জুলুমের শিকার হই। তারপরও ইচ্ছা ছিলনা ডাকাতিতে নামার কিন্তু বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছিল। এবারও বছরখানেক সময় ডাকাতির পর সুযোগ পেয়ে আত্মসমর্পণ করলাম। সরকার ও প্রশাসনের কাছে দাবি আমাদের মামলাগুলো যেন সহজ করে দেওয়া হয়। আর আমরা নতুন করে যেন কোন হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার না হই। আমরা যেন টুকটাক ব্যবসা বাণিজ্য করে বেঁচে থাকতে পারি।"
বাহিনীর অন্য সহযোগীরা সুন্দরবনের হাড়হিম করা জীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, "সারাক্ষণ প্রশাসনের ভয়ে থাকতে হতো। ছিল না ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া ও ঘুমও। যখন-তখন মৃত্যুর ভয় নিয়ে জীবনটাকে ঠোঁটের মাথায় নিয়ে চলতে হতো। কোস্টগার্ড সুযোগ দেওয়ায় আমরা আত্মসমর্পণ করলাম।"
কোস্টগার্ডের অভিযানের চোখধাঁধানো সাফল্য
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ অভিযানের ধারাবাহিকতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত সুন্দরবন অঞ্চল থেকে ২৬টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৭৮ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৫ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৮৭ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি এবং ২টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মোট ২১ জন বনদস্যুকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং দস্যুদের আস্তানা থেকে ২০ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।