
ভালো চাকরি আর আকাশচুম্বী বেতনের রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে ৩০ জন যুবককে রাশিয়ায় নিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখ সমরে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার এক লোমহর্ষক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। ভাগ্যবিড়ম্বিত এই যুবকদের মধ্যে ৩ জনের বাড়িই গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায়।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, জাবালে নূর নামক একটি এজেন্সি ও স্থানীয় দালাল চক্র উন্নত কর্মসংস্থানের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ওই যুবকদের রাশিয়ায় পাঠায় এবং পরবর্তীতে সেখানে নিয়ে জনপ্রতি ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে রুশ বাহিনীর হাতে তুলে দেয়।
গোপালগঞ্জের ৩ যুবকের ভাগ্যবিপর্যয়
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ার বিমান ধরেছিলেন গোপালগঞ্জ সদরের সিতারকুল এলাকার লিচু ফকিরের ছেলে রনি ফকির। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরপরই রুশ সেনাবাহিনী তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নেয়। এরপর জোরপূর্বক তার কাছ থেকে এক বছরের একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। রনি পরে জানতে পারেন, জাবালে নূর এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে রুশ বাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। বর্তমানে তাকে যুদ্ধের প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি পরিবারকে জানিয়েছেন।
শুধু রনিই নন, তার মতো আরও ৩০ জন বাংলাদেশি যুবক একই ভাগ্যবরণ করেছেন, যাদের মধ্যে গোপালগঞ্জ সদরের আরও দুজন রয়েছেন। তারা হলেন— সদর উপজেলার ঘোষের চর গ্রামের জামিল শেখের ছেলে পলাশ শেখ এবং বলাকৈড় গ্রামের কবির মোল্লার ছেলে সৌরভ মোল্লা। এই খবর আসার পর থেকে ভুক্তভোগীদের পরিবারে এখন শুধুই কান্নার রোল।
স্বজনদের আর্তনাদ ও হাড়হিম করা বিবরণ
ভুক্তভোগী রনির স্ত্রী রাবেয়া নিজের ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করে বলেন, "আমার স্বামীকে টেকনোলজি কোম্পানিতে চাকরি দেবে বলে রেজা নামি স্থানীয় এক দালাল ৭ লাখ টাকার চুক্তিতে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর সেখানকার সেনাবাহিনী তাকে জোর করে ১ বছরের চুক্তি করিয়ে নেয়। আমার স্বামী আমার কাছে ফোন দিয়ে এসব বলেছে। আরও বলেছে যে বর্তমানে তাদের রাশিয়া-ইউক্রেনের বর্ডারের পাশে রাখা হয়েছে। তাকে বর্তমানে যুদ্ধের জন্য সাময়িক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমাদের দাবি আমার স্বামীকে তারা যেন সঠিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়।"
একইভাবে প্রতারণার শিকার সৌরভ মোল্লার বোন রত্না বলেন, "আমার ভাই সৌরভের কাছ থেকে স্থানীয় দালাল রেজা ও মিজান ৭ লাখ টাকা নিয়ে ঢাকার জাবালে নুর এজেন্সির মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। আমার ভাই সেখানে পৌঁছানোর পরে জানতে পারে তাদেরকে সেখানকার রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের জন্য পোশাক পায়ের বুট জুতা মাপ নিয়ে তৈরি করতে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে দিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে যে যুদ্ধ সেই যুদ্ধ করাবে।"
সীমান্তের ওপার থেকে আসা পলাশ শেখের ভাই আবু সালেহ তার ভাইয়ের এক মর্মস্পর্শী বার্তা তুলে ধরে বলেন, "রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরে প্রথম দিন পলাশ জানিয়ে ছিল সে ভালোভাবে পৌঁছেছে। এরপর তিন দিন তার সঙ্গে যোগাযোগ নেই। দুই দিন আগে হঠাৎ আমাদের ফোন দিয়ে বলে আমি ভালো নাই, এতোটুকুই বলে আর কোন কথা বলে না। পরে অন্য একজনের মাধ্যমে আমাদের কাছে খবর পাঠিয়েছে যে, তাকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা করে নিয়েছে এজেন্সি ও দালাল। পলাশ বলেছে, যদি বেঁচে থাকি তবে হয়তো কোনদিন দেখা হবে কারণ আমাদেরকে সেনাবাহিনী কিনে নিয়েছে ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করানোর জন্য। বর্তমানে আমাদেরকে একদম ইউক্রেনের বর্ডার সাইডে রাখা হয়েছে। সেখানে মাঝেমধ্যেই এসে বোম পড়ছে। আমাদের সাময়িক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধের জন্য। এছাড়া আমাদের জন্য সেখানকার সেনাবাহিনীর পোশাক ও বুট জুতা তৈরি করা হচ্ছে।"
প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাস
এই আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও প্রতারণার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, "ভুক্তভোগী পরিবারদের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
অন্যদিকে, যুবকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ বলেন, "বিষয়টি খুবই দুঃখজনক আমরা প্রশাসককে নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।"