
হাদির বোন মাসুমা হাদি জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁর ভাই শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। তিনি বলেছেন, “পুরো গ্যাং যেন সামনে আসে এবং জড়িত সবাইকে বিচারের আওতায় আনা হয়। শুধু ফয়সাল যেন বলির পাঁঠা না হয়। ফয়সালের ফাঁসি দিয়ে অন্যদের আড়াল করা হলে তা কখনোই ন্যায়বিচার হবে না।”
হাদির হত্যার প্রায় আড়াই মাস পর, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে। এসটিএফের রোববার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শনিবার রাতের সময় উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার বনগাঁ এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়।
ফয়সাল গ্রেপ্তার হলেও হাদির পরিবার এখনও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। মাসুমা হাদি বলেন, শুধু ফয়সালকে ফাঁসি দিয়ে যেন ‘পর্দার আড়ালের মূল খুনিদের’ আড়াল করা না হয়।
হাদি জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের ঘোষণা করেছিলেন। ১২ ডিসেম্বর গণসংযোগের সময় বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করা হয়। হামলাকারীরা চলন্ত মোটরসাইকেলের পেছনে বসে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
গুরুতর আহত হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়, যেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
মাসুমা হাদি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার খাসমহল এলাকায় বাড়িতে বসে গণমাধ্যমকে বলেন, “ফয়সাল একজন শুটার। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এতে আমরা কিছুটা আশাবাদী যে তার বিচার হবে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কারা জড়িত, ফয়সালকে কে নির্দেশ দিয়েছে, কে অর্থ জুগিয়েছে এবং কারা তাকে জেল থেকে জামিনে বের করতে সহায়তা করেছে, এসব বিষয়ও তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা প্রয়োজন।”
হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। পরে মামলায় হত্যার ৩০২ ধারা যুক্ত হয় এবং থানা পুলিশের হাতে থাকা তদন্তের দায়িত্ব ডিবি পুলিশকে দেওয়া হয়।
ডিবি পুলিশ তদন্ত শেষে সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ ১৭ জনকে আসামি করে ৬ জানুয়ারি হাদি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দায়ের করে। অভিযোগপত্রে ডিবি পুলিশের পরিদর্শক ফয়সাল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, প্রাথমিকভাবে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হাদিকে হত্যা করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগীরা আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভোটারদের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদির নির্বাচনী প্রচারে অনুপ্রবেশ করেছে।
তবে মামলার বাদী আবদুল্লাহ আল জাবের নারাজি দাখিল করায় আদালত সিআইডিকে মামলাটি নতুন করে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছে। মাসুমা হাদি বলেন, “অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এবং ফয়সাল ও আলমগীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।”
হাদির বাবা ঝালকাঠির একটি মাদ্রাসায় শিক্ষক ছিলেন। হাদির শিক্ষাজীবন শুরু হয় নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায়, পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এক সময় তিনি ইংরেজি শেখানোর কোচিং সেন্টার সাইফুরসে শিক্ষকতা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছিলেন।
হাদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়েছে।