
স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ রোগীর জন্য এক যুগান্তকারী ও আশার খবর জানিয়েছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, বিশেষ একটি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এখন বিপুলসংখ্যক স্তন ক্যান্সার রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপির মতো কষ্টদায়ক চিকিৎসা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের (ইউসিএল) নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্তর্জাতিক গবেষণার ফল গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিশ্বের বৃহত্তম ক্যান্সারবিষয়ক সম্মেলন ‘আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলোজি’র (ASCO) বার্ষিক সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে।
‘প্রোসিগনা’ পরীক্ষা: যেভাবে কাজ করে
গবেষকরা স্তন ক্যান্সারের এই বিশেষ ডিএনএ পরীক্ষার নাম দিয়েছেন ‘প্রোসিগনা’ (Prosigna)। এই পদ্ধতিতে টিউমারের ৫০টি জিনের গতিবিধি এবং জৈবিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়, যা মূলত শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিকিৎসকরা হিসাব করে দেখতে পারেন যে, রোগীর শরীরে পুনরায় ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি ঠিক কতটা।
গবেষণার মূল ফলাফল
যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ডের ৪০ বছরের বেশি বয়সী ৪ হাজারের বেশি স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত নারীর ওপর এই গবেষণা চালানো হয়। ফলাফলগুলো নিম্নরূপ:
দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর কেমোথেরাপির প্রয়োজন নেই: গবেষণায় দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের শরীরে ক্যান্সার ফিরে আসার ঝুঁকি বেশ কম। ফলে তারা কেমোথেরাপি সম্পূর্ণ এড়িয়ে শুধু ‘হরমোন থেরাপি’র মাধ্যমেই সুস্থ থাকতে পারেন।
বেঁচে থাকার প্রায় সমান হার: পাঁচ বছর মেয়াদি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, কেমোথেরাপি না নেওয়া (কম ঝুঁকিপূর্ণ) রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৩.৭%। অন্যদিকে, কেমোথেরাপির মধ্য দিয়ে যাওয়া উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৪.৯%। অর্থাৎ, কম ঝুঁকিপূর্ণদের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি না দিলেও তা চিকিৎসার সাফল্যে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।
কেমোথেরাপির ধকল থেকে মুক্তি
স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক চিকিৎসায় সাধারণত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমার অপসারণের পর ক্যান্সার কোষ ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়। তবে কেমোথেরাপির ফলে রোগীদের চুল পড়া, প্রচণ্ড ক্লান্তি, বমিভাব, প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো মারাত্মক সব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এই গবেষণার ফলে রোগীরা যেমন শারীরিক ও মানসিক ধকল থেকে মুক্তি পাবেন, তেমনি যুক্তরাজ্যের এনএইচএস (NHS)-এর মতো স্বাস্থ্যসেবা সংস্থাগুলোর বিপুল পরিমাণ সম্পদ ও খরচের সাশ্রয় হবে।
গবেষক ও রোগীর বক্তব্য
গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান, ইউসিএল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের স্তন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রব স্টেইন বলেন, "এই ফল ক্যান্সার চিকিৎসাকে ব্যক্তিভেদে আলাদা (Personalized Medicine) করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এর অর্থ হলো, এখন শুধু প্রচলিত লক্ষণের ওপর নির্ভর না করে টিউমারের জৈবিক বৈশিষ্ট্য দেখে নিখুঁত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।"
গবেষণায় অংশ নেওয়া কার্ডিফের ৬৪ বছর বয়সী রোগী কারেন বনহ্যাম এই পরীক্ষার মাধ্যমে কেমোথেরাপির ধকল এড়াতে পেরেছেন। নিজের স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি একে ‘বড়দিনের উপহার’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, “ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া এবং এর চিকিৎসা শুরু হওয়া— দুটোই জীবনে বড় ধাক্কা। এই পরীক্ষা আমাকে অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচিয়েছে।”
ভবিষ্যতের সীমাবদ্ধতা: ইউসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই গবেষণার ইতিবাচক ফল আপাতত ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। ৪০ বছরের কম বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা সমভাবে কাজ করবে কি না, তা জানতে আরও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
