
দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধি ও জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে ‘নেট মিটারিং’ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি গ্রাহককে কেবল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী নয়, বরং উৎপাদক হিসেবেও ভূমিকা রাখার সুযোগ দিচ্ছে।
নেট মিটারিং হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে গ্রাহক নিজস্ব ছাদ বা স্থাপনায় সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেন। প্রথমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজস্ব ব্যবহারে খরচ হয়, আর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার সময় সেই অতিরিক্ত ইউনিট বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।
সহজভাবে বললে, দিনে উৎপাদিত বাড়তি বিদ্যুৎ ‘ক্রেডিট’ হিসেবে জমা থাকে, যা রাতে বা প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা যায়।
এ ব্যবস্থায় দ্বিমুখী মিটার ব্যবহার করা হয়, যা একদিকে গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুৎ এবং অন্যদিকে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ আলাদাভাবে হিসাব রাখে।
নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ বিল কমে যাওয়া। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন ও বড় আবাসিক স্থাপনাগুলো এতে উল্লেখযোগ্যভাবে খরচ কমাতে পারে।
এছাড়া গ্রীষ্মকালে দিনের বেলায় যখন বিদ্যুৎ চাহিদা বেশি থাকে, তখন সৌরবিদ্যুৎ সরাসরি গ্রিডে যুক্ত হয়ে লোড কমাতে সাহায্য করে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমে এবং বিদ্যুৎ ঘাটতি বা লোডশেডিং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানোর ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গ্যাস, কয়লা ও তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
পরিবেশগত দিক থেকেও নেট মিটারিংকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে কার্বন নিঃসরণ হয় না। ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে এটি সহায়ক ভূমিকা রাখে।
রপ্তানিমুখী শিল্পখাতেও এর প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাড়তি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে, যা প্রতিযোগিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বর্তমানে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনে ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। তৈরি পোশাক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে বিপুল পরিমাণ অব্যবহৃত ছাদ থাকা সত্ত্বেও সম্ভাবনার তুলনায় ব্যবহার এখনো সীমিত। প্রাথমিক বিনিয়োগ ব্যয়, সচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু প্রশাসনিক জটিলতা এ খাতের বড় বাধা হিসেবে রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সহজ শর্তে অর্থায়ন, কর সুবিধা এবং দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করা গেলে নেট মিটারিংয়ের বিস্তার আরও দ্রুত হতে পারে।
এ বিষয়ে বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে এবং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। তার মতে, বাধা দূর করে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া জরুরি।
সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নেট মিটারিংকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ব্যবস্থা নয়, বরং গ্রাহককে ‘প্রসিউমার’ বা একই সঙ্গে উৎপাদক ও ভোক্তায় রূপান্তর করার একটি আধুনিক মডেল।