
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সোনাহাট সেতুর স্টিলের পাটাতন ধসে পড়ায় সব ধরনের ভারী যান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে সোনাহাট স্থলবন্দরের সামগ্রিক পণ্য পরিবহন কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় ১৪০ বছরের পুরোনো এই জরাজীর্ণ সেতুটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে এমন বিপত্তি এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বুধবার (১ জুলাই) সকালের দিকে বালুভর্তি একটি ড্রাম ট্রাক পার হওয়ার সময় হঠাৎ পাটাতন ভেঙে সেতুর ওপর আটকে যায়। এই ঘটনার পর থেকে সেতুর উভয় পাশে পণ্যবাহী ট্রাকসহ অসংখ্য সাধারণ যানবাহনের দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয়েছে, যাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সেতুটি চরম বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এর বিভিন্ন অংশের স্টিলের পাটাতন ভেঙে গেছে এবং লোহার প্লেট (ট্যাংক জ্যাম) আলগা হয়ে পড়েছে। এরপরও জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন শত শত যানবাহন এই মৃত্যুফাঁদ দিয়েই যাতায়াত করছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে ১৮৮৭ সালে লালমনিরহাট থেকে ভারতের গৌহাটি পর্যন্ত রেললাইন সংযোগের উদ্দেশ্যে দুধকুমার নদের ওপর প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট লম্বা এই সোনাহাট রেলসেতুটি তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের অগ্রসর হওয়া রুখতে সেতুর একটি অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে এটি মেরামত করে ভূরুঙ্গামারীর দক্ষিণের তিনটি ইউনিয়নসহ কচাকাটা ও মাদারগঞ্জ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগের পথ উন্মুক্ত করা হয়।
নির্মাণের সময় এই সেতুর সর্বোচ্চ মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১০০ বছর। সেই অনুযায়ী চার দশক আগেই এর কার্যকারিতার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে পুরো সেতুটি ধসে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। এটি স্থায়ীভাবে অচল হলে সোনাহাট স্থলবন্দরের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়বে।
এদিকে, এই ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোর পাশেই দুধকুমার নদের দক্ষিণ অংশে ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ একটি নতুন সোনাহাট সেতু নির্মাণের কাজ চলছে। মাত্র দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কেবলই বাড়ছে। এলাকাবাসী দ্রুত এই নতুন সেতুর কাজ শেষ করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
সেতু সংলগ্ন এলাকার ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও নুর ইসলাম বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন:
"পাথরবোঝাই ট্রাক চলাচলের সময় পুরো সেতু থরথর করে কেঁপে উঠে। সেতুটি এতটাই সরু যে, একটি ট্রাক চলাচলের সময় অন্য কোনো যানবাহন যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে প্রায়ই দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।"
স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী আবু হেনা মাসুম অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন:
"প্রায়ই সেতুর পাটাতন ভেঙে যায়, পরে সড়ক বিভাগ তা মেরামত করে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় জনগুরুত্বপূর্ণ এ সেতু দিয়ে পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হলে স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে।"
জরুরি পদক্ষেপের বিষয়ে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ বলেন:
"সেতুটি দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত পণ্য বহনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
কুড়িগ্রাম সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ সার্বিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করে বলেন:
"সেতুটি দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংস্কারকাজ শেষ করে, যত দ্রুত সম্ভব যান চলাচল স্বাভাবিক করা হবে। এ সেতু প্রায় ১৪০ বছরের পুরনো। আয়ুষ্কাল অনেক আগেই শেষ হয়েছে। নতুন করে বিকল্প সেতু নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।"