
কর্মচারীকে মালিক সাজিয়ে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সাবেক দুই ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন।
সোমবার (২ মার্চ) দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে চার্জশিট অনুমোদন দেওয়া হয়। শিগগিরই তা আদালতে জমা দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলাটি দায়ের করা হয়।
যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট
অনুমোদিত চার্জশিটে আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—
সাইফুজ্জামান চৌধুরী, তার স্ত্রী ও ইউসিবির সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান, সাবেক সহ-সভাপতি বজল আহমেদ বাবুল, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল এহতেশাম আবদুল মোহাইমিন, সাবেক পরিচালক ইউনুছ আহমদ, এম এ সবুর, আসিফুজ্জামান চৌধুরী, হাজী আবু কালাম, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, রোকসানা জামান চৌধুরী, বশির আহমেদ, সৈয়দ কামরুজ্জামান, মো. শাহ আলম ও ড. সেলিম মাহমুদ।
এছাড়া ব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা শ্রাবন্তী মজুমদার, সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মুঝায়োনা সিদ্দিকা, সাবেক সহকারী সহসভাপতি ও ঋণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম রাকিব, সাবেক সহকারী সহসভাপতি ও ব্যবস্থাপক (অপারেশন) মোসাদ্দেক মো. ইউসুফ এবং কারওয়ান বাজার শাখার সাবেক প্রধান আলমগীর কবিরের নামও রয়েছে।
নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন—প্রোগ্রেসিভ ট্রেডিংয়ের মালিক মোহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী, ইম্পেরিয়াল ট্রেডিংয়ের মালিক মো. আব্দুল আজিজ এবং মো. ইয়াছিনুর রহমান।
তবে ইউসিবির সাবেক পরিচালক শরীফ জহিরকে মামলার আসামি করা হলেও চার্জশিটে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে ঋণ অনুমোদন
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রোগ্রেসিভ ট্রেডিং নামে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কারওয়ান বাজার শাখায় যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই হিসাব খোলা হয়। পরে মিথ্যা তথ্যসম্বলিত পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করে শাখা পর্যায় থেকে ২৩ কোটি টাকার ঋণের সুপারিশ পাঠানো হয় প্রধান কার্যালয়ে।
প্রধান কার্যালয়ের ঋণ কমিটি নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ থাকা সত্ত্বেও পরিচালনা পর্ষদের ৪২৪তম সভায় ঋণটি অনুমোদন দেয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, আরামিট গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর আত্মীয়কে মালিক দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন করানো হয় এবং পরে অর্থ উত্তোলন, স্থানান্তর ও পাচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২)(৩) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিদেশে সম্পদের অভিযোগ
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ‘দ্য মিনিস্টার্স মিলিয়নস’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, বিদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পদ রয়েছে, যার মধ্যে যুক্তরাজ্যেই রয়েছে শতাধিক বাড়ি।
এরপর দুদক অনুসন্ধানে নামে। আদালতের আদেশে সাইফুজ্জামান ও তার স্ত্রী রুকমীলার নামে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯টিসহ বিভিন্ন দেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও জমি ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
এছাড়া তাদের নামে থাকা ৩৯টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জমা রয়েছে। পৃথক আদেশে ১০২ কোটি টাকার শেয়ার ও ৯৫৭ বিঘা জমিও জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।