
লোকালয়ে সাপ ঢুকেছে-এমন খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, কৃষিজমি কিংবা মাছের ঘের-যেখানেই সাপের উপস্থিতির খবর মেলে, সেখান থেকেই নিরাপদে সেটিকে উদ্ধার করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেন। গত তিন দশকে এভাবে প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার সাপ উদ্ধার করেছেন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার পরিবেশকর্মী শামছু তালুকদার। তবে দীর্ঘ এই ঝুঁকিপূর্ণ সেবার পরও মেলেনি সরকারি স্বীকৃতি বা আর্থিক সহায়তা।
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন রায়েন্দা ইউনিয়নের চালরায়েন্দা গ্রামের বাসিন্দা শামছু তালুকদার (৬২)। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘সাপের বন্ধু’ নামে পরিচিত। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণই তাঁর এই কাজের মূল উদ্দেশ্য।
শামছু তালুকদার জানান, গত ৩০ বছরে তিনি বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজার সাপ উদ্ধার করেছেন। কোথাও সাপের খবর পেলেই দ্রুত সেখানে পৌঁছে যান। উদ্ধারকাজের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক দাবি করেন না। তবে কেউ স্বেচ্ছায় কিছু দিলে তা গ্রহণ করেন।
তাঁর ভাষ্য, সাপ উদ্ধারে অধিকাংশ সময় ব্যয় হওয়ায় নিয়মিত অন্য কোনো পেশায় যুক্ত থাকা সম্ভব হয়নি। নিজের কোনো জমিজমা নেই। সরকারি বেড়িবাঁধসংলগ্ন জমিতে একটি ছোট টিনের ঘরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করেন। আর্থিক সংকট নিত্যসঙ্গী হলেও মানুষের সেবার কাজ থামিয়ে দেননি।
শামছু বলেন, একসময় তিনি চট্টগ্রামের একটি শিপইয়ার্ডে চাকরি করতেন। পরে আরও তিন সহকর্মীর সঙ্গে ভারতে কামরূপ-কামাখ্যায় যান এবং সেখানে প্রায় ১৮ বছর অবস্থান করেন। সে সময় দেবাষি রায় নামে এক সাপুড়ের কাছে সাপ ধরার কৌশল শেখেন। দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মানুষের নিরাপত্তা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ শুরু করেন।
তিনি জানান, বিষধর ও নির্বিষ সাপ চেনার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় এখন পর্যন্ত কোনো বিষধর সাপের ছোবলে আক্রান্ত হননি। তবে সাপ উদ্ধার করতে গিয়ে অন্তত ৫০০ বার নির্বিষ সাপের কামড় খেয়েছেন।
তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনসেবামূলক এই কাজ করলেও এখনো কোনো সরকারি স্বীকৃতি পাননি। এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়ও তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এরপরও শারীরিক সক্ষমতা থাকা পর্যন্ত সাপ উদ্ধার ও নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করার কাজ চালিয়ে যেতে চান বলে জানান তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, লোকালয়ে সাপ দেখা দিলে আতঙ্কিত মানুষ প্রথমেই শামছু তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর দ্রুত উপস্থিতি ও অভিজ্ঞতার কারণে বহু মানুষ যেমন ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেয়েছেন, তেমনি অযথা সাপ হত্যার ঘটনাও কমেছে।