
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে হেলাল উদ্দিন নামের এক যুবককে গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে ৫০ বেত্রাঘাত ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার ঘটনা ঘটেছে।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে সালিশের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি সামনে আসে। ভিডিওটি প্রকাশের পর বিচার প্রক্রিয়ার বৈধতা এবং ভুক্তভোগী শিশুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। জানা গেছে, ওই সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সকালে শিশুটি পাশের একটি দোকান থেকে জিরা মসলা কিনে বাড়ি ফিরছিল। তার সঙ্গে ছিল ছোট বোনও। অভিযোগ রয়েছে, পথিমধ্যে অভিযুক্ত হেলাল উদ্দিন শিশুটিকে দোকানের ভেতরে ডাকেন। পরে ছোট বোনকে বাইরে বসিয়ে রেখে শিশুটিকে দোকানের পেছনে নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করা হয়। শিশুটি চিৎকার করে বেরিয়ে এলে আশপাশের লোকজন বিষয়টি টের পান এবং পরে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও শিশুকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তকে ৫০ বেত্রাঘাত এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এই শাস্তি আদালতের নির্দেশে নয়, স্থানীয় সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কার্যকর করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ভুক্তভোগী পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় তারা আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তাদের দাবি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে এর আগেও নারীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছিল। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
তবে অভিযুক্ত হেলাল উদ্দিন নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচারের শিকার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি এবং তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এ অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, তিনি একসময় ইউনিয়ন যুবলীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি জামায়াতের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে শুরু করেন।
তবে হরণী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির হাফেজ তারিফুল মাওলা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, হেলাল উদ্দিন তাদের দলের কোনো সদস্য বা দায়িত্বশীল কর্মী নন। তার ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পর অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। হেলাল উদ্দিনও একইভাবে কয়েকটি কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন।
হরণী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মমতাজ বেগম বলেন, যৌন নিপীড়নের মতো ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিশ কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ভুক্তভোগী পরিবার থানায় অভিযোগ করলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, হরণী ইউনিয়ন মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেক সময় এমন ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের নজরে আসে না।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।