
ভারতের আয়তনে বৃহত্তম রাজ্য রাজস্থান তার গৌরবময় ইতিহাস, বিশাল দুর্গ, রাজকীয় প্রাসাদ, বর্ণিল সংস্কৃতি ও থর মরুভূমির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ইতিহাস আর স্থাপত্যের এই রাজ্যে বিস্ময়কর স্থাপনারও অভাব নেই। তেমনই একটি অনন্য স্থাপনা হলো বিকানেরের ভান্দাসর জৈন মন্দির, যা স্থানীয়ভাবে ‘ঘি’র মন্দির’ নামে পরিচিত।
লোককথা অনুযায়ী, প্রায় ৫৫০ বছর আগে নির্মিত এ মন্দিরের নির্মাণকাজে পানির পরিবর্তে ঘি ব্যবহার করা হয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, চুন-সুরকির সঙ্গে খাঁটি ঘি মিশিয়ে মন্দিরটির নির্মাণ করা হয়। যদিও এ দাবির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা প্রামাণ্য ভিত্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে, তবু মন্দিরটিকে ঘিরে এই কিংবদন্তি আজও দর্শনার্থীদের কৌতূহল বাড়িয়ে তোলে।
রাজস্থানের মরু শহর বিকানেরে পানির সংকট দীর্ঘদিনের। স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথা অনুসারে, ধনী জৈন বণিক ভান্দাসা অসওয়াল ১৪৬৮ সালে জৈন ধর্মের পঞ্চম তীর্থঙ্কর সুমতিনাথকে উৎসর্গ করে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। সে সময় এলাকায় তীব্র খরা ও পানির সংকট থাকায় নির্মাণকাজে পানির বদলে ঘি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে প্রচলিত রয়েছে।
মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ হতে সময় লাগে প্রায় ৮৪ বছর। ১৫১৪ সালে ভান্দাসার মৃত্যু হলেও নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৫৫৪ সালে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
তিনতলা এ মন্দির লাল বেলেপাথর ও শ্বেতপাথরে নির্মিত। দেয়ালজুড়ে সূক্ষ্ম পাথরের কারুকাজ, রঙিন চিত্রকর্ম এবং কাঁচের শিল্পকর্ম মন্দিরটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে। জৈন ধর্মের ২৪ জন তীর্থঙ্করের কাহিনিও মন্দিরের বিভিন্ন অংশে খোদাই করা রয়েছে।
বর্তমানে ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগ বা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই) মন্দিরটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে। মন্দিরের উঁচু অংশ থেকে বিকানের শহরের বিস্তৃত দৃশ্যও উপভোগ করা যায়।
স্থানীয়দের আরেকটি প্রচলিত দাবি, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে মন্দিরের দেয়াল থেকে ঘি মিশ্রিত তরলের মতো কিছু বেরিয়ে আসে। কেউ কেউ একে ‘মন্দিরের ঘাম’ বলেও উল্লেখ করেন। তবে এ ঘটনারও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পানির বদলে সত্যিই কতটা ঘি ব্যবহার করা হয়েছিল কিংবা ঘি মেশানো নির্মাণসামগ্রী দেয়ালকে কতটা শক্তিশালী করেছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ভান্দাসর জৈন মন্দির আজও ভারতীয় স্থাপত্য ও লোকবিশ্বাসের এক বিস্ময়কর নিদর্শন। প্রতি বছর ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য পর্যটক এর অনন্য কারুকাজ ও রহস্যময় ইতিহাস দেখতে বিকানেরে ছুটে আসেন।