
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইনি দায়বদ্ধতা ও বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের (Climate Justice) দাবিতে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক মোড় তৈরি হলো জাতিসংঘে। ভানুয়াতুসহ ১২টি দেশের যৌথ নেতৃত্বে উত্থাপিত জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় গৃহীত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক এই ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় ১৪১টি দেশ। বিপক্ষে অবস্থান নেয় ৮টি দেশ এবং ভোটদানে বিরত ছিল আরও ২৮টি রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক মহল এই ফলাফলকে জলবায়ু কূটনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছে।
আইসিজে (ICJ)-এর পরামর্শমূলক মতামতের শক্তিশালী ভিত্তিএই প্রস্তাবটি মূলত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস) ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রদত্ত জলবায়ু পরিবর্তন ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব সংক্রান্ত পরামর্শমূলক মতামতকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানায়।আইসিজে-এর ওই মতামত অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রী C-এর মধ্যে সীমিত রাখার জন্য সব রাষ্ট্রের একটি আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। জাতিসংঘের এই ভোটাভুটির পর জলবায়ু পরিবর্তন আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো।
গৃহীত প্রস্তাবের মূল দিকসমূহ
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পাস হওয়া এই প্রস্তাবে কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে:
কার্বন নিঃসরণ হ্রাস: দ্রুত ও টেকসই পন্থায় কার্বন নিঃসরণ হ্রাস নিশ্চিত করতে হবে।
জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির জবাবদিহি: জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী ও বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আইনি জবাবদিহি বাড়াতে হবে।
মানবাধিকারের স্বীকৃতি: সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশের অধিকারকে মানবাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আরও শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠা করা।
জলবায়ু অর্থায়ন: উন্নত দেশগুলোর জলবায়ু অর্থায়নের (Climate Finance) পূর্ব প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা।
অগ্রগতি প্রতিবেদন: জাতিসংঘ মহাসচিবকে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি বিশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রগুলো এই নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে নিজেদের নীতি পরিবর্তন করছে তা মূল্যায়ন করা হবে।
জলবায়ু নিষ্ক্রিয়তা এখন আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন
এই ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা এটিকে জলবায়ু ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে একটি বিশাল টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
গ্রিনপিস মেনা (Greenpeace MENA)–এর নির্বাহী পরিচালক গিওয়া নাকাত বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। জলবায়ু নিষ্ক্রিয়তা এখন আর কেবল পরিবেশগত ব্যর্থতা নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে জবাবদিহিতার প্রশ্নে পরিণত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মতো অঞ্চলগুলো তীব্র তাপপ্রবাহ, পানি সংকট ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ভোট স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, জলবায়ু ন্যায়বিচার আর কেবল রাজনৈতিক ভাষণের বিষয় নয়, বরং বাস্তব নীতি ও আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়।
দূষণকারী অর্থ পরিশোধ করবে’ নীতি ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ
প্রস্তাবের সবচেয়ে সংবেদনশীল রাজনৈতিক দিক হলো—জীবাশ্ম জ্বালানির বিস্তার পুরোপুরি বন্ধ করে বিশ্বকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নিয়ে যাওয়া। পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে। কারণ উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে বেশি কার্বন নিঃসরণ করলেও, উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
তবে এই মেকানিজমে “দূষণকারী অর্থ পরিশোধ করবে” (Polluter Pays Principle) নীতিটিকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে আনা হয়েছে। প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি দূষণকারী দেশ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জলবায়ু ক্ষতির আর্থিক দায়ভার বহন করতে হবে।
ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য অস্তিত্বের লড়াই
ভানুয়াতুসহ ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই প্রস্তাবের গুরুত্ব অপরিসীম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব দেশের অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে। তাদের দৃষ্টিতে, এই প্রস্তাব কেবল কোনো কাগুজে নীতি নয়, বরং এটি তাদের বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
অন্যদিকে, কিছু বড় অর্থনীতির দেশ এই কঠোর আইনি ব্যাখ্যার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এটি ভবিষ্যতে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে ২০২৭ সালের মধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে জমা দিতে যাওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনের সময়সীমা রাষ্ট্রগুলোকে এখন থেকেই তাদের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নীতি পরিবর্তনে এক ধরণের আইনি চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।