
টানা দুই মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত শেষে শান্তির আশায় আলোচনার টেবিলে বসলেও, তেহরান ও ওয়াশিংটনের অনমনীয় অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনায় বসলেও পাঁচটি মৌলিক বিষয়ে বড় ধরনের মতভেদের কারণে সেই প্রক্রিয়া এখন খাদের কিনারায়। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, স্থায়ী কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের রাখা শর্তগুলো এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলোচনার টেবিলে অমীমাংসিত ৫ শর্ত—
পারমাণবিক কর্মসূচির মেয়াদ
ওয়াশিংটন চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিক। তবে তেহরান এই দাবিতে অসম্মতি জানিয়ে বলেছে, যেকোনো ধরণের বিধিনিষেধ কেবল নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্যই কার্যকর হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়।
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে ইরানের কাছে থাকা ৮৮০ পাউন্ড বা ৪০০ কেজি উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিরোধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, এই বিপজ্জনক মজুত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তবে এই প্রস্তাবকে শুরুতেই নাকচ করে দিয়েছে ইরান।
হরমুজ প্রণালি ও অবরোধ প্রত্যাহার
অবরোধ তুলে নেওয়ার প্রশ্নে দুই পক্ষই নিজ অবস্থানে অনড়। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা না তোলা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি থাকবে। এর বিপরীতে ট্রাম্পের সাফ হুঁশিয়ারি—চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগে কোনো অবরোধ প্রত্যাহার করা হবে না।
আটকে থাকা অর্থ ও অর্থনৈতিক মুক্তি
একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর চুক্তির শর্ত হিসেবে ইরান বিদেশে আটকে থাকা তাদের প্রায় ২০ বিলিয়ন (২ হাজার কোটি) ডলার ফেরত চেয়েছে। একইসঙ্গে দেশটির ওপর আরোপিত সব ধরণের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার দাবিও তোলা হয়েছে।
২৭০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ক্ষতিপূরণ
সবচেয়ে নাটকীয় শর্তটি এসেছে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে। তেহরান দাবি করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তাদের যে ব্যাপক অবকাঠামোগত ও জানমালের ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেশ দুটিকে যৌথভাবে ২৭০ বিলিয়ন (২৭ হাজার কোটি) ডলার প্রদান করতে হবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পাঁচ শর্তের মারপ্যাঁচে শান্তি প্রক্রিয়া এখন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি এবং ইরানের পক্ষ থেকে রাখা আকাশচুম্বী ক্ষতিপূরণের দাবি—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা এই অচলাবস্থা কাটাতে কোনো জাদুকরী সমাধান বের করতে পারেন কি না।