
আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তীকালীন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন তেহরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল পুনর্গঠন তহবিল অনুদান দিচ্ছে—এমন গুঞ্জন ও দাবিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, হোয়াইট হাউস সরাসরি তেহরানকে কোনো অর্থ সাহায্য দিচ্ছে না; বরং ইরান যদি পরমাণু চুক্তির সব শর্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে, তবে অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোকে সেখানে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এনডিটিভি এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ভূ-রাজনৈতিক তথ্য প্রকাশ করেছে।
সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় হওয়া নতুন শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে যাচ্ছে। আর এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক।
সম্প্রতি জনপ্রিয় টকশো ‘দ্য মেগিন কেলি শো’-তে এই স্পর্শকাতর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জেডি ভ্যান্স ব্যাখ্যা দেন যে, ইরান যদি চুক্তির সব শর্ত মেনে চলে, তবে দেশটির ওপর পূর্ব আরোপিত কড়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ শিথিল করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো তেহরানের বুকে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া।
বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে আরও সহজভাবে বুঝিয়ে তিনি বলেন, যদি সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অর্থ বিনিয়োগ করতে চায়, তবে বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কঠোর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর সেই কারণেই শান্তি প্রক্রিয়া সচল রাখতে কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘অনেকে বলছেন আমরা ইরানকে অর্থ দিচ্ছি। বাস্তবে তা নয়। আমরা বলছি, ইরান যদি তার আচরণ পরিবর্তন করে এবং চুক্তির শর্ত মেনে চলে, তাহলে অন্য দেশগুলোকে তাদের অর্থনীতির পুনর্গঠন ও জনগণের সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।’
এর আগে প্রভাবশালী বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছিল যে, মার্কিন-ইরান কাঠামোগত চুক্তির নথিতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিলের রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চুক্তি প্রক্রিয়ার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে তারা জানায়, প্রস্তাবিত এই বিশাল অংকের অর্ধেকেরও বেশি অর্থায়নের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যেই নিশ্চিত হয়ে গেছে।
ওই সূত্রের দাবি, এই বিশেষ তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো চূড়ান্ত ও স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য উভয় পক্ষকে একটি আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেওয়া। তবে এটি কোনোভাবেই যুদ্ধজনিত পুনর্গঠন ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি বা সরকারি অনুদানভিত্তিক কোনো প্রকল্প নয়। এতে মার্কিন সরকারের কোনো তহবিল বা অর্থ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র, পারস্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রসমূহ, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন বড় বড় বেসরকারি কোম্পানি এখানে সরাসরি বিনিয়োগ করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই তহবিল থেকে মূলত ইরানের জ্বালানি, পরিবহন ব্যবস্থা, লজিস্টিকস এবং ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন শিল্প খাতে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করা হবে। এই মেগা ফান্ডের সম্ভাব্য নাম হিসেবে ‘রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফান্ড’ বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুসারে, চলমান উত্তেজনার মাঝে যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ বাবদ ইরান প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল অংক দাবি করেছিল। তবে ওয়াশিংটন শুরুতেই তা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারা তেহরানকে এই ধরনের কোনো অর্থ প্রদান করবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ ও সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও গত চার দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক মহলের একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে ইরান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কোনো সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করতে পারেনি। অথচ এই দেশটির বুকেই লুকিয়ে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রমাণিত প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত এবং চতুর্থ বৃহত্তম খনিজ তেলের সমাহার।
শুধু প্রাকৃতিক সম্পদই নয়, এর পাশাপাশি ইরানের রয়েছে ৯ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম, শিক্ষিত ও তরুণ জনগোষ্ঠী। সেই সাথে পেট্রোকেমিক্যাল, মূল্যবান খনিজ, পর্যটন ও কৃষি খাতে দেশটির রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিলের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশের ব্যাংকে জব্দ থাকা ইরানের রাষ্ট্রীয় তহবিল বা সম্পদ মুক্ত করার সমান্তরাল আলোচনার সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রক্রিয়া এবং এদের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়নের সময়সীমাও আলাদা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দেশের মধ্যে একটি চূড়ান্ত ও গ্রহণযোগ্য চুক্তি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত এই তহবিল কোনোভাবেই গঠন বা কার্যকর করা হবে না। প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে এই ফান্ডের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সূত্রটি আরও জানায়, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পরই কেবল এই তহবিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। আর অন্তর্বর্তীকালীন এই ৬০ দিনে ফান্ডের নিয়োজিত প্রশাসকরা ইরানি কর্তৃপক্ষ ও আগ্রহী বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বসে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও কাজের পরিধি চূড়ান্ত করবেন।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছেন যে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাতের স্থায়ী অবসান ঘটানো, তেহরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে দুই পক্ষই একটি বড় ধরনের কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে।