
মাগুরা-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল নির্বাচন ও সক্রিয় রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সাত বছরের কারাবাস, রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত থাকা এবং পরিবারের ওপর নেমে আসা চরম ভোগান্তির কারণে তিনি আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। একই সঙ্গে সক্রিয় রাজনীতি থেকেও নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বাকি জীবন পরিবারকে সময় দিয়ে শান্তিতে কাটাতে চান বলে জানান তিনি।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় স্মরণ করে কাজী সালিমুল হক কামাল লেখেন, ২০০৮ সালের পর তিনি রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। পরে ২০১৭ সালে একটি মিথ্যা মামলায় তাকে কারাবরণ করতে হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর অসুস্থ শরীর নিয়েই ২২ আগস্ট তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির দিন নেতাকর্মীদের ভালোবাসা ও আবেগ তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, মুক্তির পর গত ১৬ মাসে মাত্র চারবার মাগুরায় গেছেন। প্রতিবারই নেতাকর্মীদের চোখে ভালোবাসার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কষ্ট ও বেদনার ছাপ দেখেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছর ধরে মাগুরার ত্যাগী নেতাকর্মীরা মামলা, হামলা, জেল ও নির্যাতন সহ্য করেও বিএনপির পতাকা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।
স্ট্যাটাসে দলীয় হাই কমান্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তৃণমূলের আবেগ ও অনুভূতির কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন সামনে রেখে মাগুরা-২ আসনে প্রাথমিক প্রার্থী ঘোষণার পর যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও বঞ্চনারই প্রতিফলন।
তিনি দাবি করেন, মাগুরা-২ আসনের ৫১৩ জন দায়িত্বশীল নেতার মধ্যে ৫০১ জন, ১৯টি ইউনিয়নের ১৮ জন সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুইজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান লিখিতভাবে ওই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে তৃণমূলের সেই মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কাজী সালিমুল হক কামাল আরও বলেন, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের চেষ্টা দলকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করছে। এতে ভবিষ্যতে দলের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়ায় ধর্মভীরু ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতে ইসলামির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে—এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ফিরলে দলের অবস্থান কী হবে, সেটিই ছিল তৃণমূলের প্রধান দুশ্চিন্তা বলেও তিনি জানান।
স্ট্যাটাসে তিনি আরও বলেন, তৃণমূলই দলের প্রাণ। হাজার হাজার ত্যাগী কর্মীকে উপেক্ষা করে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলে দল শক্তিশালী না হয়ে ভেতর থেকে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে তার দায়ভার দলকেই নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, নেতাকর্মীদের চাপেই তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে দলের বর্তমান অনড় অবস্থান দেখে তিনি বুঝেছেন, তৃণমূলের যুক্তি ও আবেগের কোনো মূল্য দেওয়া হচ্ছে না।
সবশেষে পরিবারের একান্ত অনুরোধের কথা তুলে ধরে কাজী সালিমুল হক কামাল বলেন, তিনি আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে চিরতরে অবসর নিচ্ছেন। তরুণদের উদ্দেশে তিনি সতর্ক করে বলেন, রাজনীতিতে এগিয়ে যাওয়ার বহু সুযোগ রয়েছে—একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন তাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে।
“তৃণমূল জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ।”