
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ তাপপ্রবাহ এখন নতুন উদ্বেগের নাম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া পরিস্থিতি মহাদেশটির ইতিহাসে জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ডগুলো ভেঙে দিতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফ্রান্সে চরম সতর্কতা জারি থাকা এলাকায় মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, অন্যদিকে স্পেন ও জার্মানিতে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজন।
মাত্র এক মাস আগে মে মাসে ইউরোপের কয়েকটি দেশে রেকর্ড গড়া তাপপ্রবাহ দেখা গেলেও পরিস্থিতি দ্রুত আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কা, আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও বাড়বে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এমন ঘন ঘন ও তীব্র তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সরাসরি প্রভাব। জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আবহাওয়া আরও দীর্ঘস্থায়ী ও মারাত্মক হতে পারে।
ফ্রান্সে রেড অ্যালার্ট, নিষিদ্ধ মদ্যপান
তীব্র গরমের মধ্যেও ফ্রান্সে ঐতিহ্যবাহী পথসংগীত উৎসব ‘ফেত দ্য লা মিউজিক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে প্যারিসের বিখ্যাত ল্যুভর পিরামিডের নিচে আয়োজন করা একটি বিনামূল্যের কনসার্ট বাতিল করেছে কর্তৃপক্ষ।
সরকার জানিয়েছে, যেসব অঞ্চলে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি রয়েছে, সেখানে উৎসব চলাকালে জনসমাগমস্থলে মদ্যপান নিষিদ্ধ থাকবে।
দেশটির বিভিন্ন স্থানে তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসোস শহরে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। বর্তমানে ৩৫টি বিভাগকে রেড অ্যালার্টের আওতায় আনা হয়েছে, যা দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল। জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সোমবারের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে ৪৯-এ পৌঁছাতে পারে।
গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি দিতে প্যারিস প্রশাসন ক্যানেল সাঁ-মার্তাঁ খালে সাঁতারের অনুমতি দিয়েছে।
জার্মানিতে বজ্রঝড়ে স্থগিত টেনিস ফাইনাল
চরম আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে জার্মানিতেও। প্রবল বজ্রঝড়ের কারণে বার্লিন ওপেন টেনিস টুর্নামেন্টের ফাইনাল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে দর্শক ও খেলোয়াড়দের সরিয়ে নেওয়া হয় এবং প্রায় ছয় ঘণ্টা পর খেলা পুনরায় শুরু হয়।
সপ্তাহান্তে বার্লিনে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। পরে রোববার বিস্তীর্ণ এলাকায় বজ্রঝড় আঘাত হানে।
বেলজিয়ামে রেকর্ড তাপমাত্রার শঙ্কা
রোববার বেলজিয়ামের তাপমাত্রাও ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। দেশটির আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাস বিভাগের প্রধান ডেভিড ডেহেনাউ সতর্ক করেছেন, আগামী সপ্তাহে দেশটি ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে পারে।
প্রচণ্ড গরমের কারণে রেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে জাতীয় রেল কোম্পানি ব্যস্ত সময়ের কিছু ট্রেন বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে।
স্পেনে ৪৪ ডিগ্রির পূর্বাভাস
স্পেনে চলতি বছরের প্রথম আনুষ্ঠানিক তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে রোববার থেকে, যা বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে রাজধানী মাদ্রিদে স্পেন ও সৌদি আরবের বিশ্বকাপ ম্যাচ উপলক্ষে সরাসরি প্রদর্শনীর আয়োজন বাতিল করা হয়েছে।
প্রতিবেশী পর্তুগালেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রচণ্ড গরমে বহু মানুষ সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেছেন, কেউ হাতে পাখা, কেউবা ছাতা ব্যবহার করে রাস্তায় চলাফেরা করেছেন।
সুইজারল্যান্ডে বিশেষ সতর্কতা
সুইজারল্যান্ডের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমানে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’ চলছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলগুলোতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।
বলকান অঞ্চলেও বাড়ছে উদ্বেগ
বলকান অঞ্চলের কয়েকটি দেশে আগামী দিনগুলোতে ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি হতে পারে। ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্রোয়েশিয়া ইতোমধ্যে স্বাস্থ্যবিষয়ক সতর্কতা জারি করেছে। একই সঙ্গে উত্তর মেসিডোনিয়া, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও মন্টেনেগ্রো সম্ভাব্য তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কর্তৃপক্ষ জনগণকে পর্যাপ্ত পানি পান, সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যে জুনের ইতিহাস বদলে যেতে পারে
যুক্তরাজ্যের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দেশজুড়ে তীব্র গরমের পরিস্থিতি বিরাজ করতে পারে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকবে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ‘উষ্ণমণ্ডলীয় রাত’ দেখা যেতে পারে, অর্থাৎ রাতেও তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামবে না।
রয়্যাল মেটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির প্রধান নির্বাহী লিজ বেন্টলি বলেছেন, চলতি সপ্তাহে দেশটি নজিরবিহীন তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হতে পারে। তার মতে, তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে জুন মাসের আগের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ভেঙে যাবে।
অন্যদিকে রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান গবেষক অক্ষয় দেওরাস সতর্ক করে বলেছেন, “আমরা এমন এক তীব্র ও রেকর্ডভাঙা তাপপ্রবাহের মুখোমুখি হচ্ছি, যার ব্যাপক প্রভাব জনস্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জরুরি সেবার ওপর পড়বে।”
সূত্র: এএফপি