
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নরেন্দ্র মোদি সরকার ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যেভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে, তাতে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতি দেশটিকে গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় বিরোধীদের নতুন কৌশল ও সৃজনশীল উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সমালোচকেরা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্ঞানেশ কুমারকে এভাবে সুরক্ষা দেওয়ার ফলে তিনি আরও বিতর্কিত ও দুর্বল হয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর জন্য নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লড়াই কঠিন হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তা এই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিরোধীদের সঙ্গে সাক্ষাতে শর্ত, কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, মোদি সরকারের বিরোধী নেতাদের সঙ্গে দেখা করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেন অনীহা দেখাচ্ছেন? অভিযোগ অনুযায়ী, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রে এবারই প্রথম নির্বাচন কমিশন প্রটোকল বা শিষ্টাচারের বিষয়টি সামনে এনেছে।
জ্ঞানেশ কুমার বিরোধী নেতাদের সরাসরি সাক্ষাতের পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রতিনিধি পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি বৈঠকের জন্য একাধিক শর্তও আরোপ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে এই অনীহা নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো করছে। তাঁদের অভিযোগ, কমিশন ক্রমেই মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার অংশ হয়ে উঠছে।
প্রায় ৩০০ সংসদ-সদস্য রাস্তায়, পুলিশের মধ্যস্থতার প্রস্তাব
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের প্রধান ও বিরোধী দলনেতাসহ প্রায় ৩০০ সংসদ-সদস্য যখন রাস্তায় নেমেছিলেন, তখন নির্বাচন কমিশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানায়। কমিশন ও বিরোধী নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে পুলিশকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহারের এই অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এমন আচরণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ভূমিকা ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
একই সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার অভিযোগকে নিছক প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে দেখার বিরুদ্ধেও প্রতিবেদনে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই প্রক্রিয়া বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদী শক্তির কর্তৃত্ববাদী লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করা হচ্ছে।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম, নারী ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তাঁদের মতে, এসআইআরকে শুধু নির্বাচনি হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিশ্লেষণ করলে এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বরং প্রযুক্তির ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক অধিকার থেকে দূরে সরিয়ে রাখার আশঙ্কাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মুসলিম ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিকে কেবল বিজেপির নির্বাচনি সুবিধা অর্জনের কৌশল হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা আড়ালে থেকে যায়। সমালোচকদের ব্যাখ্যায়, এর সম্ভাব্য লক্ষ্য মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার সংকুচিত করে তাদের কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করা।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও ব্যাপ্তি নির্ধারণে ভোটার তালিকা সংশোধনের তথ্য, প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও নাগরিকদের ভোটাধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ক ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহির প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।