
ঢাকার দোহার উপজেলার আড়িয়াল বিলজুড়ে এবার বোরো ধানের ফলন নিয়ে কৃষকদের মুখে ছিল স্বস্তির হাসি। কয়েক বছর পর অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো উৎপাদনের আশায় মাঠজুড়ে ব্যস্ততা ছিল ধান কাটাকে ঘিরে। কিন্তু ঠিক সেই সময়ের টানা বৃষ্টি অনেক কৃষকের স্বস্তিকে নতুন দুশ্চিন্তায় বদলে দিয়েছে। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান, বাড়ছে কাটার খরচ, আর সময়মতো ঘরে তুলতে না পারার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
মঙ্গলবার (৫ মে) দোহারের নিকড়া ও আড়িয়াল বিল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাঁটুসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা ধান কাটছেন। কেউ মাথায় করে ধানের বোঝা রাস্তার পাশে তুলছেন, আবার কেউ ঘোড়ার গাড়িতে করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। বৃষ্টির কারণে অনেক ক্ষেতেই ধান পানিতে নুয়ে পড়েছে। ফলে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে কাটার খরচও।
স্থানীয় কৃষক আবুল হোসেন জানান, এবার তিনি ১২ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। ফলনও হয়েছে আগের চেয়ে ভালো। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে তার অনেক জমি পানির নিচে চলে গেছে। একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘পানির নিচে নেমে শ্রমিকরা ধান কাটতে চায় না। যারা কাটে, তাদের বেশি মজুরি দিতে হচ্ছে।’
শুধু স্থানীয় কৃষক নন, বাইরে থেকে ধান কাটতে আসা শ্রমিকদেরও পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। মানিকগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক রবিউল ইসলাম বলেন, পানিতে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধান কাটতে গিয়ে শারীরিক কষ্ট বাড়ছে। সময়ও বেশি লাগছে। পাশাপাশি পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
আরেক কৃষক আজমত আলী জানান, আগাম চাষ করায় তার ধান আগে পেকেছিল। কিন্তু বৃষ্টির কারণে দ্রুত মাঠ থেকে ফসল তুলতে না পারলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। তার ভাষায়, ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ধান ঘরে তোলা না গেলে পুরো মৌসুমের লাভ কমে যেতে পারে।
কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ বাড়লেও ধানের ন্যায্যমূল্য এখনও নিশ্চিত হয়নি। নিকড়ার কৃষক রাজ্জাক হোসেন বলেন, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক সময় পাইকারি বাজারেই কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। এবার ফলন ভালো হলেও শেষ সময়ে বৃষ্টি অনেকের হিসাব পাল্টে দিতে পারে বলে আশঙ্কা তার।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে মৌসুমের শেষদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি এখন বোরো চাষের বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। মাঠে ধান পাকার সময় অতিবৃষ্টি হলে শুধু উৎপাদন নয়, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করাও ব্যাহত হয়। ফলে ভালো ফলন হলেও কৃষকের প্রত্যাশিত লাভ অনেক সময় আর থাকে না।
দোহারের আড়িয়াল বিলের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। মাঠে সোনালি ধান থাকলেও কৃষকের চোখে এখন স্বস্তির চেয়ে অনিশ্চয়তাই বেশি।