
ঢাকার মিরপুর সেকশন-৭ এলাকায় ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা গ্যাস থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার (৪ এপ্রিল) প্রধান সড়কসংলগ্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থায় এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রেনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা গ্যাসই এই বিস্ফোরণের মূল কারণ।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ড্রেনের ওপর থাকা একাধিক কংক্রিট স্ল্যাব ভেঙে ছিটকে পড়ে এবং রাস্তার একটি অংশ দেবে যায়। পাশের ড্রেনের অংশেও বড় ফাটল দেখা দেয়। আশপাশের ২ থেকে ৩টি দোকান আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিকট শব্দে কাছাকাছি কয়েকটি ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে যায় বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রাণহানির খবর নিশ্চিত হয়নি। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন পথচারী সামান্য আহত হয়েছেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের ঠিক পাশেই একটি বিড়াল বসে ছিল। সৌভাগ্যক্রমে বিড়ালটি অক্ষত অবস্থায় সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ভেতরে গ্যাস বের হওয়ার জন্য যে ম্যানহোল বা ভেন্টিং ব্যবস্থা থাকার কথা, তা অনেক জায়গায় অনুপস্থিত বা ঢেকে রাখা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কিছু দোকানদার ও ব্যবসায়ী ড্রেনের ওপরের ফাঁকা অংশ সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে গ্যাস বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে ভেতরে চাপ তৈরি হয় এবং সেই চাপ থেকেই বিস্ফোরণ ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকা এবং অবৈধভাবে কাঠামো ঢেকে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বন্ধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং নাগরিকদের সচেতনতার ঘাটতিও এ ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু করে। পরে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটও এলাকা পরিদর্শন করে। এলাকাটি বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করা হয়েছে।
এদিকে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে মিরপুর সেকশন-৭ এলাকার প্রধান সড়কের একটি অংশ বন্ধ রাখা হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশ যানবাহনগুলোকে মিরপুর-১১, রূপনগর এবং কালশী ফ্লাইওভার ব্যবহার করে বিকল্প পথে চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে। এতে আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ রুটে চাপ বেড়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্যোগে ঘটনাস্থলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিশেষজ্ঞ এবং ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যুক্ত রয়েছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে রাস্তা পরিষ্কার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে।
স্থানীয়দের মতে, এমন ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার ফল। ড্রেনেজ ব্যবস্থার নিয়ম না মানা, অবৈধভাবে কাঠামো বন্ধ করা এবং তদারকির অভাবই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে বলে তারা মনে করছেন। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ড্রেনের মুখ খোলা রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো না ঢাকার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। নগর নিরাপত্তা ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।