
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর কূটনৈতিক টেবিলে এবার চরম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনের ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় না করলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান শান্তি আলোচনা কোনোভাবেই সামনে এগোবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। একই সাথে হোয়াইট হাউস যদি নতুন করে কোনো ধরনের সামরিক দুঃসাহসিকতা দেখায়, তবে ওয়াশিংটন ‘অন্ধকার এক করিডোরে’ প্রবেশ করবে বলেও তেহরানের পক্ষ থেকে চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে (CNN) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘আলোচনা বর্তমানে অচলাবস্থায় রয়েছে এবং এই অচলাবস্থা ভাঙার দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। এখন বল ট্রাম্পের কোর্টে।’
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সইয়ের পরপরই প্রথম দফায় ১২ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করার দাবি তুলেছে তেহরান। এর পরবর্তী ধাপে আরও ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করার ব্যাপারেও তারা একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছে।
তবে মার্কিন প্রশাসনের নীতিনির্ধারকেরা আশঙ্কা করছেন, এই মুহূর্তে যদি ইরানের এই বিপুল অঙ্কের অর্থ অবমুক্ত করা হয়, তবে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য ওয়াশিংটনের হাতে থাকা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্রটি একবারে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে এমন একটি নতুন চুক্তি করতে আগ্রহী, যা অতীতে হওয়া ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির চেয়েও কয়েক গুণ বেশি কঠোর ও শর্তযুক্ত হবে। একই সাথে তিনি এমন যেকোনো সমঝোতার ঘোর বিরোধিতা করছেন, যা দেখে মনে হতে পারে যে ইরানকে সরাসরি বিপুল পরিমাণ অর্থ হস্তান্তর করছে আমেরিকা।
এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেই গত শুক্রবার ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওমান উপসাগরে টহলরত মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি ডেস্ট্রয়ারের (যুদ্ধজাহাজ) দিকে তারা ‘সতর্কতামূলক ক্ষেপণাস্ত্র’ ছুড়েছে, যার জেরে মার্কিন জাহাজ দুটি ওই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ’র (IRNA) বরাতে জানানো হয়েছে, ওমান উপসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর অনাকাঙ্ক্ষিত ‘হয়রানি, বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার জব্দের’ পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই তেহরান এই সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে তেহরানের এই দাবিকে সম্পূর্ণ অসত্য ও কাল্পনিক বলে সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। এক বিবৃতিতে সেন্টকমের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘ইরানি বাহিনী মার্কিন যুদ্ধজাহাজে কোনো হামলা চালায়নি বা গুলি ছোড়েনি। এমন ঘটনা ঘটলে তা যুদ্ধবিরতির গুরুতর লঙ্ঘন হতো।’
তারা আরও স্পষ্ট করেছে যে, মার্কিন নৌবাহিনী ওই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক জলসীমায় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অবরোধ কঠোরভাবে বলবৎ রেখেছে।
প্রসঙ্গত, গত ৮ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এই ঘটনাটি নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করল। এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সমন্বিত সামরিক অভিযানের মাধ্যমে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত ঘটেছিল, যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে এক ব্যাপক যুদ্ধে রূপ নেয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর বড় ধরনের মুখোমুখি সংঘাত বন্ধ থাকলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলমান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলোচনাগুলো এখনো চূড়ান্ত কোনো সাফল্যের মুখ দেখেনি।
এদিকে গত বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের মূল সামরিক অভিযানটি ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে এবং ওয়াশিংটন বর্তমানে ইরানের ওপর আর কোনো ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, মার্কিন বাহিনী এই অভিযানের মাধ্যমে ইরানের অবশিষ্ট বিমানবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতা পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং দেশটির প্রচলিত নৌবাহিনীকেও কার্যত অচল করে দিতে সক্ষম হয়েছে।
উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব নৌ অবরোধ জারি করেছিল, যার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সব বন্দরে পাল্টা কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ গড়ে তোলে। ভৌগোলিক বিবেচনায়, স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সংবেদনশীল প্রণালি দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে যাতায়াত করে।
এরই মধ্যে এক বিশেষ কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তাঁরা ইরানের সাথে সম্ভাব্য পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখা নিয়ে কাজ করতে পারেন—এমন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিশেষজ্ঞদের সাথে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন।
বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান হলো, ইরানের সাথে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের চূড়ান্ত চুক্তি করতে হলে দেশটিকে অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ব্যাপারে শতভাগ সুস্পষ্ট ও আইনি গ্যারান্টি দিতে হবে।
তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা ও দেশগুলোর ধারণা, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৯০০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যার একটি বড় অংশ অতীতে মার্কিন বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে সংরক্ষিত ছিল। যদিও তেহরান শুরু থেকেই পশ্চিমাদের এই দাবি অস্বীকার করে আসছে এবং বরাবরই জোর দিয়ে বলছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নিজস্ব অধিকার তারা বজায় রাখবে।
তথ্যসূত্র: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন