
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের যেসব থানা এলাকায় ছাত্র-জনতা ‘শহীদ’ হয়েছেন, সেসব এলাকার ওসি, এসপি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সংগঠনটি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে।
রোববার (০৪ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি রিফাত রশিদ এ ঘোষণা দেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় দায়িত্বে থাকা এসব কর্মকর্তার ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা হবে।
সম্প্রতি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় গিয়ে ‘বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম’ বলে ওসিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা মাহদী হাসান গ্রেপ্তার হন। ওই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সংগঠনটি কর্মসূচি ঘোষণা করে।
শনিবার রাতে মাহদীর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে শাহবাগ অবরোধ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দুই দফা দাবি তোলে। রোববার সকালে মাহদী জামিন পেলেও সন্ধ্যার সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ আগের দুই দফার সঙ্গে আরও একটি দাবি যুক্ত করে তিন দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সারাদেশে যে যে থানার অধীনে ছাত্র-জনতাকে শহীদ করা হয়েছে, সেসব থানার ওসি এবং এসপি থেকে শুরু করে তদূর্ধ্ব কমান্ডিং অফিসারদের তালিকা তৈরি করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।”
তিনি আরও বলেন, “এই তালিকা আইসিটি ট্রাইব্যুনালে জমা দান পূর্বক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোনো প্রকার টালবাহানা নয়, এবার যেটা আমাদের হাদি ভাই বলে গিয়েছিলেন, কোনো টালবাহানা নয়, অ্যাকশন হবে অ্যাকশন!। আমরা এখন অ্যাকশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “ইনডেমনেটির যে অর্ডিন্যান্স, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিশ্চিত করতে আইন উপদেষ্টা এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে অবিলম্বে মতবিনিময় করে তাদেরকে চাপ দিয়ে তা জারি করতে বাধ্য করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই কাজ আজকে থেকে ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। আমাদের যখনই কোন প্রকার আপডেট আসবে, আমরা আপনাদেরকে জানাবো। আমরা আশা করবো বাংলাদেশের ছাত্রজনতা আমাদের পাশে থাকবে।”
সংগঠনটির ঘোষিত তিন দফা দাবি হলো—
১. শুধু জামিন নয়, মাহদীর নিঃশর্ত মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানার ওসিকে প্রত্যাহার করতে হবে।
২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ছাত্র-শ্রমিক-জনতার ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি দিয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে।
৩. জুলাই বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সামরিক, আধা সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবদান রাষ্ট্রীয়ভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। তাদের সম্মাননা, স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং কর্মক্ষেত্রে হয়রানি বন্ধে একটি স্থায়ী কমিশন গঠন করতে হবে। পাশাপাশি ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্যাসিবাদের রোষানলে পড়ে সশস্ত্র বাহিনীতে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল পদে পদায়নের দাবি জানানো হয়।
রিফাত রশিদ বলেন, “আমাদের দুই দফার মাঝে শুধু প্রথম দফার আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। মাহাদীকে কিন্তু নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়নি, একটি মামলায় কেবল জামিন দেওয়া হয়েছে। সুতরাং আমরা বলব, আমাদের প্রথম দফা সম্পূর্ণভাবে পূরণ হয়নি। আমাদের লড়াই জারি রাখতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আজকে ভিডিওতে দেখেছি, বাচ্চা কোলে থাকা অবস্থায় একটা মানুষকে পুলিশ পেটাচ্ছে। কোনো শিশু যখন কোলে থাকে, পৃথিবীর কোনো আইনে, কোন যুক্তিতে একটা শিশুর ওপরে কোনো পুলিশ আঘাত হানতে পারে কিনা, আমরা জানতে চাই। পৃথিবীর কোনো সভ্য রাষ্ট্রে এরকম উদাহরণ রয়েছে সেই জিনিসটা আমরা দেখতে চাই।”