
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত চত্বর ও অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। চার দিন ধরে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত এই স্থাপনা ভাঙার কাজ চললেও কার নির্দেশে এবং কোন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে এটি সরানো হচ্ছে, সে বিষয়ে প্রশাসন, পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কেউই স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এ ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় বাসিন্দা ও বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাদের না জানিয়েই স্মৃতিচিহ্নটি অপসারণ করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এটি শুধু একটি স্থাপনা সরানোর ঘটনা নয়, বরং ইতিহাসে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতিকে আড়াল করার অপচেষ্টা বলেই তারা মনে করছেন।
ভাঙার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা জানান, বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রায়ই ছোটখাটো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটায় স্থাপনাটি অপসারণ করা হচ্ছে বলে তারা শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় বলেন, ‘এ কাজটি কে করছে আমরা জানি না। পৌরসভার পক্ষ থেকে এটি করা হচ্ছে না।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অনেকেই জানান, কয়েক দিন ধরে ভাস্কর্যটি অপসারণের কাজ চললেও কারা করছে বা কেন করছে, সে বিষয়ে তারা কিছু জানেন না। তবে অধিকাংশই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণে অন্য উপযুক্ত স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।
বাসচালক সাগর হোসেন বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করে। ভাস্কর্যটি এমন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে, সড়কের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোনো গাড়ি আসছে কি না দেখা যায় না। এতে অনেক সময়ই আমাদের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়। এর আগে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরাও চাই ঝিনাইদহের ইতিহাস ও গর্ব এই বীরের ভাস্কর্য নতুন কোনো স্থানে নির্মাণ করা হোক।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল হোসেন বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ঝিনাইদহ তথা সারা দেশের গর্ব। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে নিজের জীবন দিয়ে বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস লিখে গেছেন। দিনের বেলায় তার স্মৃতিচিহ্ন অপসারণ করা হচ্ছে। আমরা দাবি করি, দ্রুত ওই স্থানে বা অন্য কোথাও বীরের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। তা না হলে এটি হবে অত্যন্ত দুঃখজনক এবং বীরকে অসম্মান করা হবে।’
জেলা বিএনপির নেতা আব্দুল মজিদ বিশ্বাস বলেন, বাস টার্মিনাল এলাকায় তৎকালীন জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা শেষ করা হয়নি। তিনি বলেন, স্থাপনাটির অবস্থানের কারণে যানবাহন চলাচলে সমস্যা তৈরি হতো। তবে যে কারণেই এটি অপসারণ করা হোক না কেন, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন ও পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসংলগ্ন সড়কের মোড়ে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বন্ধ হয়ে যায়। পরে দুই দফা মেয়র পরিবর্তন এবং দুই দফা প্রশাসক নিয়োগ হলেও আর কাজ শেষ হয়নি। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় চত্বরে আগাছা জন্মে এবং ভাস্কর্যটিও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ছিল।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাতিজা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘খবর পেয়ে আমি সরেজমিন দেখতে গিয়েছিলাম কেন অপসারণ করা হচ্ছে। আমার চাচা গোটা দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। আমাদের না জানিয়ে এটি অপসারণ করা দুঃখজনক। আমরা মনে করি, ইতিহাস থেকে তার নাম মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।’
তিনি অবিলম্বে নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, ‘এটা যে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, তা জানা ছিল না। কারণ এটা অসম্পূর্ণ। তাছাড়া জেলা প্রশাসন এটা ভাঙছে, বিষয়টি এমন নয়। অনেক আগেই এটি ওই স্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে।’
তিনি আরও জানান, নতুন করে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি প্রতিকৃতি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।