
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার মধ্যেই উপত্যকাজুড়ে বিমান হামলা চালিয়ে অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (২ আগস্ট) ভোর থেকে পরিচালিত এসব হামলায় সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, পশ্চিম গাজা শহরের আল-সুসি টাওয়ারের একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে হামলায় অন্তঃসত্ত্বা এক নারী, তার স্বামী এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী সন্তানসহ একই পরিবারের তিনজন নিহত হন। এছাড়া খান ইউনিসের আল-কারারা এলাকায় আরেকটি ফ্ল্যাটে হামলায় একই পরিবারের আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। দেইর আল-বালাহে একটি দম্পতিসহ দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে একজন, আল-মাওয়াসিতে একজন, রিমাল এলাকায় ড্রোন হামলায় দুজন এবং গাজা শহরে একটি গাড়িতে হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন।
শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ওষুধ গুদামে হামলা চালিয়ে দুটি স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস এবং আরও দুটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বুরশ বলেছেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ধ্বংসের মাধ্যমে ওষুধ ও রোগকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আল জাজিরার সংবাদদাতা মোয়াজ আল-কাহলৌত জানান, ঘটনাস্থলে একটি বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে এবং এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার মাত্র ১৫ মিনিট পরই হামলাটি চালানো হয়।
গত ৪৮ ঘণ্টায় গাজাজুড়ে নিচু দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়িয়ে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই আবাসিক ভবন ও জনসমাগমস্থলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব হামলায় শনিবার অন্তত আটজন এবং শুক্রবার আরও কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
গত শুক্রবার (৩১ জুলাই) ওয়াশিংটনের ২০ দফার গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গঠিত বোর্ড অব পিস ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীর উদ্যোগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন। ওই পরিকল্পনায় হামাস অস্ত্র ত্যাগে সম্মতি দিলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি ইসরায়েল সরকার।
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও ধারাবাহিক হামলা এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে বাধা দেওয়ার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি ‘প্রতারণায়’ পরিণত হয়েছে। কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত এক হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং চার হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েলবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মহনদ মুস্তফা বলেন, এসব চুক্তি ইসরায়েলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং তারা নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ধারাবাহিকভাবে চুক্তি লঙ্ঘন করে যাচ্ছে।
অন্যদিকে হামাসের অস্ত্র সমর্পণের সঙ্গে সেনা প্রত্যাহারের শর্তযুক্ত পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বলেছেন, হামাস পুরোপুরি অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করা হবে না। একই সঙ্গে ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন জানিয়েছেন, আলোচনা চললেও হামলা বন্ধ রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এদিকে হামাসের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা ভেস্তে দিতেই ইসরায়েল হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে। বোর্ড অব পিসের প্রধান দূত নিকোলে ম্লাদেনভ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে মধ্যস্থতাকারীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা