
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রত্যাহার সম্পন্ন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের এই স্বাস্থ্য সংস্থাটি তাদের অন্যতম ও বৃহত্তম দাতা দেশের আর্থিক সহায়তা হারাল।
এক বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। কোভিড–১৯ মহামারির সময় সংস্থাটির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি ডব্লিউএইচওকে অতিমাত্রায় ‘চীন-কেন্দ্রিক’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন।
মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানিয়েছে, মহামারি মোকাবিলায় ভুল ব্যবস্থাপনা, কাঙ্ক্ষিত সংস্কারে ব্যর্থতা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ নাকচ করে ডব্লিউএইচও মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস বলেন, ‘এই প্রত্যাহার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’
ডব্লিউএইচও পোলিও, এইচআইভি এইডস, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সংস্থাটির বৈশ্বিক ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া জোরদার করতে একটি আন্তর্জাতিক মহামারি চুক্তি তৈরির উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেছে, যেখানে ভ্যাকসিন ও ওষুধের ন্যায্য বণ্টন অন্তর্ভুক্ত।
গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া ডব্লিউএইচওর সব সদস্য রাষ্ট্র ওই মহামারি চুক্তিতে সম্মতি দেয়। ঐতিহ্যগতভাবে সংস্থাটির অন্যতম বৃহৎ দাতা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সদস্য ফি পরিশোধ করেনি। এর ফলে সংস্থাটিতে ইতোমধ্যেই বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর আইনজীবীদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এখনও ২৬০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, এই অর্থ পরিশোধের কোনও যুক্তিসংগত কারণ তারা দেখছে না। একই সঙ্গে ডব্লিউএইচওতে মার্কিন সরকারের সব ধরনের তহবিল বন্ধ করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সদর দপ্তরসহ বিশ্বজুড়ে সংস্থাটির বিভিন্ন অফিস থেকে মার্কিন কর্মী ও ঠিকাদারদের প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শত শত যৌথ কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল হয়েছে।
মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আমেরিকার দেওয়া সহায়তাকে ডব্লিউএইচও ‘কলঙ্কিত ও উপেক্ষা’ করেছে। তাদের অভিযোগ, সংস্থাটি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে প্রত্যাহার কার্যকর রাখা এবং আমেরিকান জনগণের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে ডব্লিউএইচওর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কঠোরভাবে সীমিত থাকবে।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগ নজরদারি ও রোগজীবাণু ভাগাভাগি নিশ্চিত করতে তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তবে কোন কোন দেশের সঙ্গে এই উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
পোলিও ও এইচআইভির মতো রোগ মোকাবিলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেন, এ ক্ষেত্রে এনজিও ও বিশ্বাসভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারিত্ব করা হবে। তবে এসব অংশীদারিত্বের বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বার্ষিক বৈশ্বিক ফ্লু ভ্যাকসিনের তথ্য আদান–প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না—এ প্রশ্নে কর্মকর্তারা নিশ্চিত কোনো বক্তব্য দেননি।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রত্যাহারের আদেশে স্বাক্ষরের পর ডব্লিউএইচও আশা প্রকাশ করে জানায়, সংস্থাটি চায় যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করুক, কারণ বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ এর সঙ্গে জড়িত।
শুক্রবার ডব্লিউএইচও জানায়, ২ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় বোর্ড সভার আলোচ্যসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংস্থার সচিবালয় গভর্নিং বডিগুলোর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা থাকা অনেক দেশের মহামারি মোকাবিলাকে ধীর ও ত্রুটিপূর্ণ বলে সমালোচনা করা হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, লকডাউন দিতে দেরি করার ফলে ভাইরাসের বিস্তার আরও দ্রুত হয়েছে।
সাবেক মার্কিন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড্রু অল্টম্যানের মতে, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব নিয়ে ডব্লিউএইচওর পরামর্শে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাড়া দেওয়ার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল।
একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে ফেডারেল সরকার জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয় এবং কোভিড–১৯ নীতিকে রাজনীতিকরণ করা হয়। ডেমোক্র্যাট শাসিত রাজ্যে মাস্ক বাধ্যতামূলক হলেও রিপাবলিকান শাসিত রাজ্যগুলোতে সামাজিক দূরত্ব শিথিল ও গণজমায়েতের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
জাতিসংঘের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রেও বলা হয়েছে, কোভিড–১৯ মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের ফেডারেল প্রতিক্রিয়া ছিল ধীরগতির ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার উদাহরণ।