
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষা অবশেষে আলোর মুখ দেখছে। বরিশালের আগৈলঝাড়ায় কথিত ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে ছাত্রদল নেতাসহ দুজনকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই তথা প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চার আসামির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আজ বুধবার (২০ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ সুনির্দিষ্ট এই আদেশ প্রদান করেন। একই সঙ্গে মামলাটির সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৭ জুন পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন আদালত।
আইনগত অবস্থান অনুযায়ী, এই মামলায় বর্তমানে উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম এবং এএসআই জসিম উদ্দিন কারাগারে আটক রয়েছেন। অপরদিকে, প্রধান অভিযুক্ত সাবেক এমপি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এহসান উল্লাহ এখনো পর্যন্ত পলাতক রয়েছেন।
লোমহর্ষক এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার দুই ব্যক্তি হলেন—আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।
আদালত সূত্র জানায়, নির্ধারিত কার্যসূচি অনুযায়ী আজ কারাগারে থাকা দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আদালতের পক্ষ থেকে প্রসিকিউশনের আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো পড়ে শোনানো হয়। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামিদের কাছে নিজেদের দোষ স্বীকারের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেন। এরপর ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠনের আদেশ দেন।
আজ আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ এবং প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্য আইনজীবীরা। অপরদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও শুনানির সময় এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে, গত ১৪ মে গ্রেপ্তার হওয়া দুই পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে আদালতে আইনি লড়াই করেন আইনজীবী আবুল হাসান। শুনানিতে তিনি দাবি করেছিলেন যে, তার মক্কেলরা এই হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না এবং সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগে তাদের এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। একই কায়দায়, পলাতক থাকা আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত (ডিফেন্স স্টেট) আইনজীবী আমির হোসেনও তাদের মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানিয়েছিলেন।
তার বিপরীতে প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ প্রসিকিউশনের হাতে রয়েছে। তাই তিনি অভিযোগ গঠনের জোর আবেদন জানান। দুই পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শেষে আদালত আজ অভিযোগ গঠনের জন্য এই দিনটি ধার্য করে রেখেছিলেন।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বলা হয়েছে, নিহত টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা ছিলেন তৎকালীন প্রভাবশালী নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর কট্টর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এই কারণেই তাদের দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে একটি সুগভীর নীলনকশা তৈরি করা হয়। সেই পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বরিশালের তৎকালীন এসপি এহসান উল্লাহকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি একটি সাজানো ও মিথ্যা মামলায় ওই দুজনকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা পুলিশ। এরপর গভীর রাতে আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে তথাকথিত ‘ক্রসফায়ার’-এর নাটক সাজিয়ে তাদের নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।